জীবনবৃত্তান্ত

সৈয়দ মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ

সৈয়দ মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ (সাবেক মেয়র, লন্ডন)-

সৈয়দ মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ (সাবেক মেয়র, লন্ডন) সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত (১৯৩১-২০০৯ খ্রীষ্টাব্দ)।

(ইংল্যান্ডে প্রথম এশিয়ান মেয়র)

সৈয়দ মোঃ নাসরুল্লাহ ১৯৩১ সালের ২৫ জানুয়ারী নানা খান বাহাদুর রফিকুল হাসানের কর্মস্থল আসামের শিলচরের বাসভবনে জন্ম গ্রহন করেন।তিনি সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরুদ্দীন রহঃএর পঞ্চম অধস্থন পুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল (রঃ)এর বংশের একজন সুযোগ্য অধস্থন। সৈয়দ ইসমাঈল (রঃ) থেকে বংশক্রম তার পিতা সৈয়দ মুহাম্মদ মাহমুদ (রহ:) পর্যন্ত নিম্নরুপঃ-সৈয়দ ইসমাইল (রহ:) [গোকর্ণ আদি]>সৈয়দ শাহজালাল (রহ)>সৈয়দ আহমদ (রহ:)>সৈয়দ আজিম উদ্দিন রহ>সৈয়দ শাহ ওয়াজি উদ্দিন>সৈয়দ আসাদুল্লাহ(রহ:)>সৈয়দ শাহ মহিবুল্লাহ>সৈয়দ শাহ কুদরত উল্লাহ>সৈয়দ শাহ শরাফত উল্লাহ>সৈয়দ রিয়াজত উল্লাহ>মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মালিহ্ (রহ)> সৈয়দ মুহাম্মদ মাহমুদ।

তিনি পিতা-মাতার কনিষ্ঠ সন্তান। বাবা জনাব সৈয়দ মোঃ মাহমুদ (ফররুখ মিয়া) মাওলানা সৈয়দ মালীহ সাহেবের বড় ছেলে এবং মা আসিয়া খাতুন(চান্দ বিবি) খান বাহাদুর রফিকুল হাসান এবং দাদা নওয়াব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদার একমাত্র বোন রাবেয়া খাতুনের একমাত্র মেয়ে। মা আসিয়া খাতুন মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। মাত্র ৪ বছর বয়সে মাতৃহারা হয়ে প্রথমে ঢাকায় দাদার স্নেহ ছায়ায় লালিত পালিত হন। বাবা জনাব মাহমুদ আর দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহন করেন নাই।

জনাব নাছরুল্লাহ ১৯৩৭ সালে সেন্টগ্রেগরী স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে স্কুল জীবন শুরু করেন। তারপর কিছুদিন নারায়নগঞ্জ স্কুলে লেখাপড়ার পর বরিশাল জিলা স্কুল থেকে অংকে লেটারসহ ১ম বিভাগে এস,এস,সি পাশ করেন। এইচ, এস,সি ১ম বিভাগে পাশ করার পর রাজশাহী কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি (অনার্স) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়নে (থিসিস গ্রুপে) এম,এস,সি পাশ করেন। অনার্স এবং এম,এস,সি দুই পরীক্ষায় মেধানুসারে ৪র্থ স্থান লাভ করেন।

জনাব নাছরুল্লাহ ১৯৬২ সালে পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনে নিয়োগ পাওয়ার জন্য মনোনীত হন। সে বছর পূর্ব পাকিস্তান থেকে মাত্র দুজন রসায়নবিদ পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনে নিযুক্তি পান একজন জনাব নাছরুল্লাহ এবং অন্যজন ঢাকা আনবিক শক্তি কমিশনের প্রাক্তন নিউক্লিয়ার কেমিষ্ট্রি প্রদান ডঃ আমির হোসেন খান।

১৯৬৪ সালে কলোম্বো প্ল্যান স্কলারশীপে বিলাত গমন করেন এবং তারপর থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যান। দেশে থাকাকালীন তার ছোট মামা শহীদ সাইয়েদুল হাসানের প্রভাবে সমাজতন্ত্র বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। সেই স্নেহশীল, দরদী, শান্ত, সৌম মানুষটি কেন যে এই আদর্শের প্রতি ঝুকে গিয়েছিলেন প্রথমে সেটা জানার আগ্রহই কলেজ জীবনের প্রারম্ভে এর তথ্য অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন এগুলো খুব কঠিনই মনে হতো। বিদেশে গিয়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের বই এবং বক্তৃতা বিশেষতঃ তাঁর গিল্ড সোসলিজম সম্বন্ধীয় তত্ত্ব বিশ্লেষন বিশেষ আকর্ষন করে। বৃটেনের অন্যান্য সকল বড়দলের মতো শ্রমিক দলও একটা বিরাট মহিরূহ এতে বামপন্থী(সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী) মধ্যপন্থী ও ডানপন্থী সকলেই সহ অবস্থানে বিরাজ করে।এই আদর্শের ধারাবাহিকতায় নিজেকে একনিষ্ঠ রাখতে চেষ্টা করেছেন বহু ত্যাগের বিনিময়ে। তাই আমরা দেখতে পাই উচ্চ শিক্ষার কোন স্তরে ই তিনি জমিদারী আয়ের এক পয়সাও গ্রহন করননি। নিজের উপার্জনে পড়ালেখার খরচ চালিয়েছেন। তেমনি লন্ডনের হ্যাকনী কাউন্সিলে দীর্ঘ ৪ বছর মেয়র থাকাকালীন সময়ে তাদের আইন অনুসারে প্রাপ্য কয়েক হাজার পাউন্ড মিটিং এলাউন্স গ্রহন করেন নাই।

১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফে সাইমন ড্রিং এর রিপোর্ট পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ঘৃন্য ও বর্বর পাইকারী গণহত্যার সংবাদে প্রথমে স্তম্ভিত হন এবং আক্রোশে ফেটে পড়েন। সেই রাতেই তিনি স্থানীয় বাংলাদেশীদের নিয়ে Islington Committee for Bangladesh গঠন করে মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে প্রতিশ্রতি বদ্ধ হন। সভা তাঁকে Advisory Committee র চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন। ধীরে ধীরে বিলেতে বহু প্রতিষ্ঠান এই ক্ষেত্রে কাজ করতে এগিয়ে আসেন। বাংলাদেশ সমর্থনে জুন, ৭১ এ লন্ডনের টাইম পত্রিকার এক বিরাট এডভারটাইজমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বিরাট অংশ খুব অল্প সময়েই জোগার করে দেয় ইজলিংটন কমিটি ফর বাংলাদেশ। জনাব আবু সাঈদ চৌধুরীও এই প্রতিষ্ঠানের সভায় যোগ দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই সংগ্রামকে সর্বোতভাবে সাহায্য করার জন্য বহু এমপি বিশেষতঃ লেবার এমপিদের সাথে অনবরত লবিং করেছেন। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে তিনি লেবার পার্টিতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আরম্ভ করেন। নিরবে কাজ করে যাওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। বিশেষ করে তাঁর প্রিয় ছোট মামা রাজনৈতিক দিক্ষাগুরু সাঈদুল হাসানের শহীদ হওয়ার সংবাদে প্রচন্ড আঘাত পান।

১৯৮৪ সাল থেকেই লন্ডনের হ্যাকনী কাউন্সিলে তার নিজের ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য প্রচন্ড চাপ আসতে থাকে। ৮৫ সালের শেষ দিকে বিপুল জনসমর্থনের মধ্য দিয়ে এই গুরু দায়িত্ব পালনে রাজি হন। ১৯৮৬ সালে ৮ই মে বিপুল ভোটাধিক্যে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। স্বভাবতঃ তিনি লেবার পার্টির নমিনেশন পেয়েই এমন বিজয় চিনিয়ে আনতে পেরেছিলেন। কারন এই নির্বাচনী এলাকায় উপমহাদেশের মাত্র ৫% এর কম লোকের বসবাস ছিল। রাজনীতিকে তিনি সমাজ সেবার অংগ হিসাবে গ্রহন করেছেন। লোকাল কাউন্সিলের নির্বাচনে অংশ গ্রহনে শেষ পর্যন্ত রাজী হওয়ার অন্যতম কারন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার তাড়না। বড়দাদা নওয়াব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা কিছুদিন কলকাতা করপোশনের কমিশনার ছিলেন, দাদা মওলানা সৈয়দ মালি সাহেব নারায়নগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম ভারতীয় চেয়ারম্যান, নানা খান বাহাদুর রফিকুল হাসান বানিয়াচঙ্গের চেয়ারম্যান এবং বাবা বরিশালের চরমন্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৮৬ সালে হ্যাকনী কাউন্সিল নির্বাচন পরবর্তী ১ম মিটিং এ তিনি ডিপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। পরের বছরই তিনি ১৯৮৭-৮৮ সালের জন্য বিপুল ভোটাধিক্যে মেয়র নির্বাচিত হন। দুটি কারনে এই নির্বাচনটি ছিল অভুতপূর্ব। প্রথমতঃ মেয়রপদটি সাধারনত প্রাচীন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউন্সিলারদের জন্য বহু বছরের সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ একটি সম্মাজনক রক্ষিত পদ। ২য়তঃ তিনি মেয়র পদের জন্য লেবারপার্টির ১জন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাদা মহিলা কাউন্সিলার তাঁর সংগে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। এক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বহিবিশ্বে প্রথম এশিয়ান বাঙ্গালী মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হওয়া আল্লাহর অসীম রহমত ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে। ৪ বছর কাউন্সিলার থাকাকালীন সময়ে তিনি ৩ বছর একাধারে Race and housing এর সাব কমিটির চেয়ার, কয়েকটি কমিটির ভাইসচেয়ার ৩টি কমিটি ও ৫টি সাব-কমিটির মেম্বার ছিলেন। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী হাউজিং এসোসিয়সনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

প্রতি বছর সমগ্র বৃটেনে নভেম্বরের ২য় রবিবার পালিত হয় পপি দিবস বা অজানা মৃত সৈনিক সম্মান দিবস। তিনি ১৯৮৭ সালে মেয়র থাকাকালীন সময়ে প্রথমবারের মত হ্যাকনীর প্রধান চার্চে বাইবেলের বদলে কোরআনের বানী পড়ানোর আয়োজন করেন।

কর্মজীবনে কিছুদিন লন্ডনের অর্থনৈতিক কেন্দ্র সিটিতে মার্কস গ্রুপে কাজ করেন। তারপর তৎকালীন বৃহত্তর লন্ডনেরসার্বিক স্থানীয় গভর্মেন্ট গ্রেটার লন্ডনের সিনিয়র ওয়েলফেয়ার অফিসার হিসাবে যোগ দেন। লন্ডনে বাসস্থান বরাদ্দ বর্ণবাদী অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা রুখতে বৃটেনে প্রথমবারের মত একজন Allocations Monitoring Officer in Housing পদ সৃষ্টি করা হয় জনাব নাসরুল্লাহ এই পদে প্রথম নিযুক্তি পান। পরে মার্গারেট থেচারের উদ্যোগে গ্রেটার লন্ডন কাউন্সিল বিলুপ্ত ঘোষনার ফলশ্রুতিতে বর্ণবাদ বিরোধী কাজের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে পড়ে। তারপরের কর্মস্থল টাউয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলে রেইস রিলেসন্স অফিসার, জয়েন হাউজিং টাস্ক সোর্সে সিনিনিয়র অফিসার এবং শেষে সিআরই কর্তৃক টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলের উপর বর্ণবাদী বৈষম্য না করার নোটিশ দিলে তাকে ঐ অফিসার গ্রুপে কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৯৩ সালের মে মাসে পরিপূর্ণ সময়ের পূর্বে অবসর নেয়ার পর আগস্ট ৯৪ তে টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলে তাঁকে আবাবার নিয়োগ দেয়া হয়। অবশেষে ৯৭ সালে আইনগতভাবে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও আরো ২ বছর তিন মাস চুক্তিভিত্তক নিয়োগ পেয়ে ফেব্রুয়ারী২০০০ পর্যন্ত চাকুরী করেন।

পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী আত্মপ্রচার বিমুখ, চমক দেখানোর নীতি পরিহার করে নিরবে কাজ করে যাওয়াই তাঁর পছন্দ।তিনি যক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল ক্যামিস্ট্রি, সলফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রেইস এন্ড হাউজিং এবং ওপেন ইউনিভার্সিটিতে এফেক্টিভ ম্যানেজার কোর্সে পড়াশুনা করেন। অবসর গ্রহনের পর তিনি প্রতি বছরই ছোটে আসতেন বাংলাদেশে বিশেষ করে বড়ভাই ও একমাত্র বোন প্রাক্তন রাস্ট্রপতি মরহুম বিচারপতি আহসান সাহেবের স্ত্রী সৈয়দা আয়েশা চৌধুরীর সান্নিধ্য কামনায়।

আত্মপ্রচার বিমুখ নিরহংকার এই মানুষটি ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, বোন সৈয়দা আয়েশা চৌধুরী, ভাতিজা-ভাতিজি ও গুনগ্রাহী অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে যান। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী বানিয়াচঙ্গে নানা বাড়ীর পারিবারিক গোরস্তানে তাঁর মায়ের কবরে পাশে সবুজ ঘাসের আস্তরনে শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায়।

মন্তব্য

  • প্রতি বছর সমগ্র বৃটেনে নভেম্বরের ২য় রবিবার পালিত হয় পপি দিবস বা অজানা মৃত সৈনিক সম্মান দিবস। তিনি ১৯৮৭ সালে মেয়র থাকাকালীন সময়ে প্রথমবারের মত হ্যাকনীর প্রধান চার্চে বাইবেলের বদলে কোরআনের বানী পড়ানোর আয়োজন করেন।

  • প্রতি বছর সমগ্র বৃটেনে নভেম্বরের ২য় রবিবার পালিত হয় পপি দিবস বা অজানা মৃত সৈনিক সম্মান দিবস। জনাব সৈয়দ নাছরুল্লাহ ১৯৮৭ সালে মেয়র থাকাকালীন সময়ে প্রথমবারের মত হ্যাকনীর প্রধান চার্চে বাইবেলের বদলে কোরআনের বানী পড়ানোর আয়োজন করেন।

  • সৈয়দ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ নাসরুল্লাহ শব্দগুলো তো ‘স’ দিয়েই হওয়ার কথা এখানে ‘ছ’ ব্যবহার করার কারণ জানালে খুশী হবো। সৈয়দ নাসরুল্লাহ সাহেব কিন্তু ‘স’ দিয়েই লিখতেন এবং লিখতেন ‘নাসরুল্লাহ সৈয়দ’ – ইংল্যাণ্ডের নিয়মানুযায়ী।

মতামত দিন