প্রবন্ধ

আজ নবীবংশের চতুর্থ নক্ষত্র ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালামের পবিত্র শুভ বিলাদত শরীফ।

আজ এই দিনে মদীনায় ৩৮ হিজরির ৫ ই শাবান জন্ম নিয়েছিলেন নবীবংশের চতুর্থ নক্ষত্র,আল্লাহর হুজ্জাত হযরত ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম।এমন এক মহাপুরুষের কথা বলছি যাঁর রক্তধারা পৃথিবীর বুকে প্রকৃত ইসলামকে টিকিয়ে রেখেছে। ইসলামকে বিলীন করে দেয়ার উমাইয়া ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে শহীদগণের নেতা ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালার যে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন সে বিপ্লবের বাণী ও প্রকৃত ঘটনা যিনি পরবর্তী যুগের মুসলমানদের জন্যে সংরক্ষিত করেছিলেন তিনিই হলেন আমাদের আজকের আলোচ্য মহাপুরুষ হযরত ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম।
আজ এই মহামানবের বিলাদত শরীফ উপলক্ষ্যে সবাইকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা মুবারকবাদ ও তার মহান সত্তার শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম ।
বিশ্ব ইতিহাস নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রসহ মানবীয় মূল্যবোধের সবক্ষেত্রেই যাঁদের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী তাঁদের মধ্যে হযরত ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম তথা ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) অবস্থান অত্যন্ত প্রজ্জ্বোল ও শীর্ষস্থানীয়।সত্যিকারের ও উন্নত মানুষ গড়ার এই মহান সত্তা ইমাম ‘জয়নুল আবেদিন’ বা ‘খোদা প্রেমিকদের অলঙ্কার’ হিসেবেও খ্যাত। মহান আল্লাহর দরবারে অত্যধিক সিজদায় মগ্ন থাকতেন বলে ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-কে বলা হত সাজ্জাদ
কারবালার বিশ্বনন্দিত মহাবিপ্লবের ঘটনায় ইমাম হুসাইন (আ.)’র একমাত্র যে পুত্র বেঁচেছিলেন তিনি হলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)। অর্থাত তিনিই ছিলেন বিশ্বন’বী (স.)’র পবিত্র বংশধারার বা আহলে বাইতের একমাত্র পুরুষ সদস্য যিনি কারবালার ঘটনায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন। অসুস্থ ছিলেন বলে তিনি ওই জিহাদে সরাসরি যোগ দিতে পারেননি। আসলে মহান আল্লাহ অলৌকিকভাবেই তাঁকে রক্ষা করেছিলেন মুসলিম জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এবং ইসলামের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ভিত্তি রচনার জন্য।
হযরত ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম যে ঘরে বসে কারাবালার ঘটনা বর্ণনা করতেন সে ঘরটাকে ‘বাইতুল হুজন’ বা দুঃখের ঘর বলা হত। মসজিদে যেহেতু কারবালার ঘটনা আলোচনা করার সুযোগ ছিল না সেহেতু ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের সমর্থক-অনুসারীরা নিজ নিজ এলাকায় শুধু কারবালা-ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামকে কেন্দ্র করে বিশেষ ঘর নির্মাণ করতেন। যে প্রথাটা তখন থেকে এখনও সমগ্র বিশ্বে বিদ্যমান। সেই বিশেষ ঘরগুলোকে আরব-পারস্যে হোসাইনিয়া, পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশে আশুরাখানা/ ইমামবাড়া(ইমামবারগাহ)/ মোকাম বলা হয়।
ইমাম জয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম সেসময় যে দোয়া-মুনাজাতগুলো পাঠ করেছিলেন, সেগুলো পরবর্তীতে ‘সহীফায়ে সাজ্জাদিয়া’ নামে সংকলন করা হয়। সম্প্রতি হুজ্জাতুল ইসলাম আব্দুল কুদ্দুস বাদশা এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি আরবী ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন।সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া’ নামে তাঁর দোয়া ও মুনাজাতের অমর গ্রন্থটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ছাড়াও সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারের নানা দিক-নির্দেশনায় সমৃদ্ধ। ইমামের রেখে যাওয়া ‘রিসালাতাল হুক্বুক্ব’ শীর্ষক অধিকার সংক্রান্ত নির্দেশনা মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার চেয়েও বিস্তারিত ও আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর।
ইমাম সাজ্জাদ সব সময় দিনে রোজা রাখতেন ও পুরো রাত জেগে ইবাদত করতেন। রোজা ভাঙ্গার সময় তিনি বাবার ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থার কথা উল্লেখ করে এত বেশি কাঁদতেন যে অশ্রুতে খাবার ভিজে যেত। জীবনের শেষ পর্যন্ত এই অবস্থা ছিল তাঁর। একদিন তাঁর খাদেম ইমামের কান্নারত অবস্থায় তাঁকে বলেন: আপনার দুঃখ ও আহাজারি শেষ হয়নি? উত্তরে তিনি বলেনঃ তোমার জন্য আক্ষেপ! ইয়াকুব (আ.) আল্লাহর একজন নবী ছিলেন। তাঁর ১২ জন সন্তান ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁর এক পুত্র ইউসুফকে চোখের আড়ালে রাখায় শোকে, দুঃখে ও অতিরিক্ত কান্নায় তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েন, চুল পেকে যায় ও পিঠ বাঁকা হয়ে যায়। সন্তান জীবিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর এ অবস্থা হয়েছিল। আর আমি আমার পিতা, ভাই এবং পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে মাটিতে পড়ে যেতে ও শহীদ হতে দেখেছি; তাই কিভাবে আমার দুঃখ ও অশ্রু থামতে পারে?
ইমাম আলী বিন হুসাইন আল যয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালামের বিলাদত শরীফ উপলক্ষে আরো একবার সবাইকে মুবারকবাদ সাথে সাথে ইমাম জয়নুল আবেদীন অালাইহিস সালামসহ আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের অন্যান্য শহীদগণের প্রতি পেশ করছি অশেষ দরুদ-সালাম।
আস সালাতু ওয়াস্ সালামু আলাইকা ইয়া আবাল হাসান ইয়া আলী ইয়াব্-নাল হুসাইন, ইয়া যাইনাল আবিদিন, ইয়াব্-না রাসূলিল্লাহ,ইয়া হুজ্জাতুল্লাহি আলা খালক্বেহি, ইয়া সাইয়্যেদানা ওয়া মাওলানা ইন্না তাওয়াজ্জাহনা ওয়া ওয়াস তাশফা’না ওয়া তাওয়াস্ সালনা বিকা ইলাল্লাহি, ওয়া ক্বাদ্দামনাকা বায়না য়্যাদায় হাজাতেনা। ইয়া ওয়াযিহান ইন্দাল্লাহি ইশ ফা‘লানা ইন্দাল্লাহি।আল্লাহুমা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম।
—সৈয়দ হোসাইন ঊল হক

About the author

Syed Hossain ul Haque

সৈয়দ হোসাইন উল হক তরফ ও শ্রীহট্ট বিজয়ী মহান মনিষী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহঃ)এর অধস্থন পুরুষ ‘নবী বংশ পরিচিতি ও মহান কোরবানি’ গ্রন্থের লেখক, হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুরাবই সাহেব বাড়ীর সিংহপুরুষ সৈয়দ মোঃ ইসহাক আল হুসাইনী (রহঃ)সাহেবের মেঝ ছেলের ঘরের বড় নাতি।মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্য গমন অতঃপর ইউনিভার্সিটি অফ সান্ডারল্যান্ড থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে অনার্স এবং কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড পলিটিক্সের উপর এম এস সি। তারপর ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি’তে এম-ফিল। শিক্ষানবিশ কালে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের বিভিন্ন ছাত্র সংঘটনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন পাশাপাশি লন্ডনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বরত।তাছাড়াও যুক্তরাজ্যে একটি ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটর লেকচারার ও গবেষনা কেন্দ্রে অবিরাম বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন।আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে “যবহে আজিম এবং জিকিরে শাহাদাত”শীর্ষক গ্রন্থখানা তার দীর্ঘ গবেষনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

মতামত দিন