প্রবন্ধ

নবীবংশ তথা সৈয়দ গনের মর্তবা

নবীবংশ তথা সৈয়দ গনের মর্তবা।

অনেকেই বলে থাকেন যে, ইসলাম ধর্মে সকল বংশ, গোত্র সমপর্যায়ের। কেউ কারো থেকে উত্তম নয়। সৈয়্দ, পাঠান, তেলি, নাপিত, ধোপা- সবাই এক সমান। কেবল পরহেজগারী বা খোদা ভীতির দিক দিয়ে কেউ কারো থেকে উত্তম হতে পারে- তবে বংশের দিক দিয়ে নয়। নিজ আমল ব্যতীত বাপ-দাদার খোদাভীরুতাও কোন কাজ দেবে না। তারা দলিল হিসেবে সুরা হুজরাতের ১৩ নং আয়াতে করীমা পেশ করেছে যে, “এবং তোমাদেরকে শাখা-প্রশাখা ও গোত্র-গোত্র করেছি, যাতে পরস্পরের মধ্যে পরিচয় রাখতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে অধিক সম্মানিত সেই, যে তোমাদের মধ্যে অধিক খোদাভীরু”। এই আয়াতের ভিত্তিতে হুজুরে করিম সঃএর নামে হাদিসও পয়দা করেছে যে, “হে ফাতেমা, আমি তোমার থেকে আল্লাহর শাস্তি উঠিয়ে নিতে পারব না”। ইত্যাদি।

  • কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাদের এহেন ধারনা, উদ্ভাবন ও বক্তব্য কি আদৌ সঠিক?

প্রকৃত সত্য তো এটাই যে কোরানুল করীম, বিশুদ্ধ হাদীস এবং আকলের নিরিখে প্রমাণিত যে আহলে বাইতে রসূল সঃএর বংশধারার মর্যাদা সকল বংশ ও গোত্রের চেয়ে উৎকৃষ্ট, এবং মুমিনদের মধ্যেও যাঁরা সৎকর্মশীল তাঁদের আমলও তাঁদের সন্তানদের কাজে আসবে। এই মর্মে কালামে কোরান, হাদিসে রসুল এবং আকলের ভিত্তি নিম্নরুপঃ

সূরা তুর এর ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বেহেস্তি বান্দাদেরকে তাঁদের সন্তান সন্ততি সহ জান্নাতে রাখবেন, যদি সেই সন্তান সন্ততিগন পিতা বা পিতৃপুরুষের ঈমানের অনুগামী হয়।যদি বেহেস্তি বান্দাদের জন্য এই পুরস্কার হয় তাহলে রসুল সঃ কিংবা মাওলা আলী আঃ কিংবা তাঁদের বংশধারার ক্ষেত্রে আপনার বিচার কি বলে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি জান্নাতের মধ্যে মু’মিনদেরকে তাদের সন্তানদের সাথে মিলিয়ে দেব এবং তাদের নেক আমলে কোন ঘাটতি করা হবে না”।

এ আয়াতের মাধ্যমে বুঝা গেল যে, কিয়ামত দিবসে মুমিনদের আওলাদগণ যেমন মুমিনগণের সাথে থাকবেন, ঠিক তেমনি নবী করীম সঃএর আওলাদগণও নবীয়ে আকরামের সাথেই থাকবেন। এ দ্বারা আওলাদে রাসূলেরই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল। এবং নেককারদের আমলই যে কেবল কাজে আসবে তাও জানা গেল।

সুরা শুয়ারায় আল্লাহপাক বলেন, “হে মাহবুব! আপনি বলে দিন, আমি এ পথ প্রদর্শন ও ধর্ম প্রচারের বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আমার আহলে বাইত তথা আওলাদে রাসূলের ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না”।

এ আয়াতের তাফসীরে আছে যে, নবীয়ে আকরাম সঃ ইরশাদকরেন, ‘হে উম্মতগণ! আমার হক্বের কারণে আমার আওলাদকে ভালবাস’। তাহলে বুঝা গেল যে, নবী আকরামের কারনেই আহলে বাইতে রাসূলকে ভালবাসা অপরিহার্য, যা অন্য কোন বংশের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র তায়ালার এরকম কোন আদেশ নেই।

সুরা আনফাল এর ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর জানিয়া রাখো, যেহাদের মাধ্যমে তোমরা যা লাভ কর তাহার এক পঞ্চমাংশ রসুলের করবা’র জন্য এবং এতিম ও মিছকীনদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো…”।

এখানে স্পষ্টত প্রমান হলো যে, গণিমতের মালের মধ্যে আওলাদে রাসূলের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটা অংশের হক রয়েছে। আওলাদে রাসূলগণ ব্যাতিত অন্য কোন বংশের জন্য এতটা বিশাল সম্মান বা এমন কিছু প্রদান করা হয়নি। আর খুমস তো কেবল নবীবংশকে প্রদানেই আল্লাহপাক বিশেষিত করে দিয়েছেন।

সুরা কাহাফের ৮২ নং আয়াতে আছে, হযরত খিজির আঃ হযরত মুসা আঃকে বললেন, এই দেয়ালের নিচে দুটো ছেলের গুপ্ত ধনভান্ডার রয়েছে। তাঁদের উভয়ের পিতা সৎ কর্মপরায়ণ ছিলেন, সে জন্য আপনার রবের ইচছা যে, উভয় ছেলে বালেগ তথা প্রাপ্ত বয়স্ক হবে এবং তারা তাদের সম্পদ বের করবে।

এ আয়াতের মাধ্যমে এটা জানা গেল যে, এ দুই এতিম শিশুর প্রতি আল্লাহ পাক এ কারণে দয়া পরবশ হয়েছেন যে, তাদের পিতা মুত্তাকী-পরহেজগার ছিলেন। প্রমানিত হলো যে, নেক্কার ব্যক্তির নেক আমলের কারণে সন্তানরাও উপকৃত হয়। তাহলে আওলাদে রসুলগনের নেক আমলের কারনে তাঁদের আওলাদগণ অবশ্যই উপকৃত হবেনা কেন?

সুরা হাদিদের ২৬ নং আয়াতে আছে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর পরে যত নবী এসেছেন সবাই তাঁদের সন্তানদের মধ্যেই হয়েছেন এবং সকল কিতাব সহীফা তাদের উপরই এসেছে। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম- এর কারণেই তাদের সন্তান সন্ততিদের এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন হয়েছে। তাই নয় কি? “হে ইয়াকুবের সন্তানগণ! ঐ সকল নিয়ামতকে স্বরণ কর, যা আমি তোমাদের দান করেছি । এবং সে সময়ে পৃথিবীর মধ্যে তোমাদেরকেই শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি”। সূরা বাকারার এই ৪৭ নম্বর আয়াত দ্বারাও তো এটা স্পষ্ট হয় যে, সে সময়ে হযরত ইয়াকুব আঃএর কারনে তাঁর বংশধরকে আল্লাহপাক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মান দান করেছিলেন। সুতরাং আজ কেন আমদের রসুলে আকরাম সায়্যিদুল মুরসালীন হওয়া সত্বেও তাঁর বংশধারা উঁচু মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হবেনা?

  • এবার আসা যাক হাদিসের দলিলেঃ

আহলে সুন্নাহের সহী মুসলিম, তিরমিযী ও মিশকাত শরীফের ফাযায়েলে সৈয়্যদিল মুরসালিন অধ্যায়ে পাওয়া যায়, “হযরত রসূলে মকবুল সঃ ইরশাদ করেন –নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ইসমাঈল আঃএর সন্তানদের মধ্যে কানানাকে নির্বাচিত করেছেন এবং বনী কানানা’র মধ্যে কুরাইশকে এবং কুরাইশদের মধ্যে বনী হাশেমকে বেছে নিয়েছেন আর বনী হাশেম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন”।

এ থেকে যা প্রতীয়মান হল, উল্লেখিত বংশগুলো পৃথিবীর অন্যান্য সকল বংশ অপেক্ষা উত্তম ও সম্মানিত।

সুন্নি গ্রন্থ বুখারি-মুসলিম উভয় গ্রন্থেই আছে যে, আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সঃ ইরশাদ ফরমান, ‘সদকাহ (যাকাত) লোকদের মধ্যে বিলিয়ে দাও, এই সাদাকা/যাকাত মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের জন্য হালাল নয়”।

এ দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, এ সমস্ত বরকত অর্জিত হয়েছে এক মাত্র নবীজীর আওলাদ হওয়ার কারণে। আওলাদে রাসূল ব্যতীত অন্যরা যতই পরহেযগার হোক না কেন এ মহত্বম সম্মান কখনো সৌভাগ্যে হবে না । তাহলে বুঝা গেল, নবীজীর আওলাদগণ কতই না উত্তম।

বুখারী, মুসলিম ও মিশকাত শরীফের মানকেবে কুরাইশ অধ্যায়ে আছে, “রসুলে খোদা সঃ বলেছেন, সমস্ত মানবজাতি কুরাইশদের অনুসারী। সাধারণ মুসলমান মুসলিম কুরাইশের অনুসারী। আর কাফেরগন কাফের কুরাইশের অনুসারী”।

বুখারী ও মুসলিম আরও রয়েছে, নবীয়ে দোজাহাঁ সঃ বলেন, এই খেলাফতের প্রতিনিধিত্ব কুরাইশদের মধ্যেই বিরাজমান থাকবে। যতক্ষণ দুজন ব্যক্তিও অবশিষ্ট থাকবে।

দূররে মুখতারে এসেছে, রাসূলে খোদা সঃ এরশাদ করেন, “কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক ব্ংশীয় ও আত্নীয়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, কেবল আমার বংশ ও আত্নীয়ের সম্পর্ক ব্যাতীত”।

যা হোক, লেখা দীর্ঘায়ীত না করে পরিশিষ্টে সবচেয়ে দরকারী একটা চিকণ কথা বলে রেখে প্রসঙ্গের ইতি টানতে চাই যে- সয়ং আল্লাহ কিন্তু নুহ নবীর ঔরসজাত পুত্র কেনানকেও নবীপুত্র হিসাবে অস্বীকার করেছেন। তাই বলছিঃ সাধু, সাবধান!

 

@sat

1 Comment

  • ইসলামে বংশধারার কোন গুরুত্ব নেই বলে যারা চরম মিথ্যাচারিতা করে যাচ্ছেন তাদের জঘন্য কুৎসিত মিথ্যাচারের বিরুদ্বে অসাধারন গবেষনামুলক তথ্য উপস্থাপনা করেছেন।
    এছাড়াও এ প্রসংগে আরও বলা যায় যে –
    “ ইয়াসীন,শপথ জ্ঞানগর্ভ কোরআনের , আপনি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত , আপনি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।”
    সূরা – ইয়াসীন / ১-৪ ।
    এখানে ‘ইয়াসীন’ বলতে কী বুঝান হয়েছে ?
    ইয়াসীন হলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) , আর এতে কোন সন্দেহ নেই ।অষ্টম ইমাম রেযা (আঃ) এর ভাষায় , আল্লাহ্ এর মাধ্যমে মুহাম্মাাদ ও আলে মুহাম্মাাদকে এক শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন ।এটা এজন্য যে , আল্লাহ্ কারও ওপর সালাম প্রেরণ করেন নি , নবীগণ ব্যতীত।
    “ নিঃসন্দেহে আমরা ইবরাহীমের বংশধরকে দিয়েছি কিতাব ও প্রজ্ঞা এবং আমরা তাদেরকে দিয়েছি এক বিশাল সার্বভৌম ক্ষমতা”।
    সুরা – নিসা / ৫৪ ।

    মহান আল্লাহ আদম ,নূহ , ইব্রাহিমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদেরকে সমগ্র বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দান করেছেন । অর্থাৎ নবুয়ত ও রেসালতের জন্য এই বংশধরকেই আল্লাহ নির্বাচিত করেছেন । এবং সুরা নিসার ৫৪ নং আয়াতে বর্নিত “সার্বভৌম ক্ষমতা” বা “মুলকান আজীম” এর ব্যাখ্যায় মাওলানা মওদুদী লিখেছেন – ‘ইমামত’ ।ঐ আয়াতেই নবীবংশের প্রতি হিংসুকদের জন্য আল্লাহ সতর্কবার্তা দিয়েছেন ।এমনকি প্রতি নামাজে নবীবংশ তথা পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) গনের প্রতি দরুদ পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ।

    সুতরাং উপরে উল্লেখিত পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ দ্বারা ষ্পষ্ট ও জোরালোভাবে প্রমান হয় যে , আল্লাহ , রাসুল (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে (আঃ) বিশ্বের সকল সৃষ্টি থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন অর্থাৎ তাঁরা ফেরেস্তামন্ডলী , জ্বীন , মানুষ , এমন কি অন্যান্য নবীদের ওপরও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ।

মতামত দিন