প্রবন্ধ

আমার বাবা: এক প্রদীপ্ত প্রদীপের কথা

সৈয়দ হাসান ইমাম হোসাইনী চিশতী(রঃ)(আউলিয়া)
আমার বাবা: এক প্রদীপ্ত প্রদীপের কথা।

বাংলা ভাষায় কঠিন অথচ গভীর অর্থবোধক কিছু শব্দের মধ্যে একটি হচ্ছে মাৎসর্য। বেশ কয়েক বছর আগ পর্যন্ত এই শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম না। অন্যের উন্নতি বা সমৃদ্ধি দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়াই হচ্ছে মাৎসর্য। শব্দটি প্রথম শুনি আব্বার কাছ থেকে। পরিচিত একজনকে উপদেশের সুরে বলছিলেন, ” ইবাদত করে তুমি যতটা এগোতে পারবে, মাৎসর্য থাকলে বা অন্তরকে কলুষমুক্ত না করতে পারলে তুমি ঠিক ততটাই পেছাবে। নফসকে পরিশুদ্ধ  না করলে  ইবাদত মূল্যহীন হয়ে পড়ে।” ফকির লালন এজন্য যথার্থই বলেছেন, “ভজনে তার নাই মজুরী সাফ লেখা যায়, -দলিলে সাফ লেখা যায়”।  আব্বার কথাগুলো বুঝার মতো উপলব্ধীগত অবস্থান তখন আমার ছিলোনা। এখন যখন অনেক বিষয়ে আগ্রহ এবং উপলব্ধী দুটোই বেড়েছে, জিজ্ঞেস করার মানুষটি তখন জগৎ সংসারের সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমরা সন্তান সহ অনেকেই বুঝতে পারিনি যে লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকতে পছন্দ করা এই নীরব সাধক মানুষটি সব স্তরের এবং সব ধর্মের মানুষের অন্তরের কতটা গভীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। শুনতে অবিশাস্য মনে হলে ও সত্যি যে আব্বার জানাজায় প্রায় লাখখানেক মানুষ অংশ গ্রহণ করেছেন। অনেক হিন্দু ভাই ও বোনেরা অঝোরে কেঁদেছেন আব্বার জন্য। আমাদের বাড়িতে এসে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সাথে দেখা করে গেছেন। অথচ আব্বার পরিচিতি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে। ভেবে অবাক হই, কি অবদান রাখতে পারলে বা বুকের গভীরে কতটা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা জমিয়ে রাখলে একজন মুসলিম সুফির জন্য অন্য ধর্মের মানুষও কাঁদেন। মানুষকে ভালোবাসা- সে যে ধর্মেরই হউক, মানুষের জন্য কিছু করার ব্যাকুলতা, অবিচল ধৈর্য্য, পরমত সহিষ্ণুতা এই বিরল গুণগুলো আব্বার মধ্যে দেখতাম। কোরআন, হাদিস, তাফসীর চর্চা, বুজুর্গানদের রচনা এবং তুলনামূলক ধর্মতত্বে প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। আরবি, ফার্সি, উর্দু এবং ইংরেজিতে যথেষ্ট বুৎপত্তি থাকার কারণে যেকোনো লেখার মূলসূত্র খুঁজে না বের করা পর্যন্ত স্বস্তি পেতেন না। দেশ বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করতেন। কোনো নিদৃষ্ট বিষয়ে রেফারেন্স থাকতো নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সূত্র থেকে। বই পড়া সম্পর্কে বলতেন, “বেঁচে থাকার জন্য শরীরের যেমন খাবার দরকার, রুহের পরিচর্যার জন্য ও প্রয়োজন সেরকম উপযোগী বই।”  অসুস্থ হওয়ার আগে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ডুবে থেকেছিলেন বইয়ের মধ্যেই। এসব বইয়ের বেশিরভাগই ছিল পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন তাফসীর, হাদিস এবং অলি বুজুর্গানদের বিভিন্ন রচনা। সেদিন পুরোনো বই ঘাটাঘাটি করতে যেয়ে খুঁজে পেলাম আমাকে দেয়া আব্বার প্রয়াত বন্ধু বিশিষ্ট তাফসীরবিদ মৌলানা মুহিউদ্দিন খান চাচার  সংকলিত পবিত্র কুরআনের নির্ভরযোগ্য বাংলা তাফসীর- “তাফসীরে মারেফুল কোরআন”। এর প্রতিটি পৃষ্টায় রয়েছে আব্বার নিজের লেখা নোট এবং রেফারেন্স কোড। বাংলা, আরবি এবং উর্দু  মিলিয়ে নিজস্য সংগ্রহ নয় দশটি ভিন্ন ভিন্ন তাফসীরের প্রতিটিতেই অসংখ্য নোট ও রেফারেন্সের ছড়াছড়ি। ফারসি ভাষায় ও  ছিল অসাধারণ দক্ষতা।  বেশিরভাগ সময় পড়তে দেখতাম তফসীরে রুহুল বয়ান, তাফসীরে নাঈমী  এবং মৌলানা আহমেদ ইয়ার খান নাঈমী সাহেবের উর্দু রচনা সমূহ। দীর্ঘশাস ছেড়ে ভাবি, পবিত্র কোরআনের কতটা গভীরে ডুব দিতে চাইলে একজন মানুষ নীরবে, নিভৃতে কোরআন চর্চায় এতটা নিমগ্ন থাকতে পারেন।

মানুষ হিসেবে অনেক সীমাবদ্দতা নিয়েই আমাদের জন্ম। মানুষের মধ্যে বেড়ে উঠা ষড়রিপুর একটি হচ্ছে মাৎসর্য। বাকিগুলি হচ্ছে লোভ, কাম, ক্ৰোধ, মোহ এবং গর্ব। একজন মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনকে কিভাবে পরিচালনা করবে অথবা কি প্রক্রিয়ায় ইহলৌকিক বা পারলৌকিক মুক্তি খুঁজে পাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে এই প্রবৃত্তিগুলো নিয়ন্ত্রণের উপর। আব্বা ছিলেন এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংযত জীবন যাপনের এক অনন্য আদর্শ। খুব অল্প ঘুম, অল্প আহার করে অনেকটা দরবেশদের মতোই জীবন কাটাতেন। প্রবৃত্তির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হয়তো কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না থাকলে এর পরিনাম হয় ভয়াবহ। ইদানিং কালের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভয়ানক অবক্ষয় এই পরিণামেরই ইঙ্গিত বহন করে। ধর্মকর্মে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, আবার অন্যদিকে বাড়ছে অন্যায় আর অবিচারের মাত্রা। ধর্মের চর্চা বাড়লে অন্যায় বাড়ার কথা নয়। এই দুইয়ের মাঝে নিশ্চয়ই কোনো ‘Missing Link’ আছে যা আমরা জানি না। আসলে লোক দেখানো অন্তসারহীন ইবাদত আল্লাহ্পাক পছন্দ করেন না। সেজন্য সূরা নিসার ১৪২ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “নিশ্চয়ই মুনাফেকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়। আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন নামকাওয়াস্তে লোক দেখানোর জন্যে দাঁড়ায়, আসলে আল্লাহকে তারা খুব কমই স্মরণ করে।” সূরা মাউনের আয়াতেও (৪-৭) একই বাণীর প্রতিধ্বনি উঠে। নামসর্বস্ব ইবাদতের অসারতা বুঝাতে যেয়ে সূরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশে পরিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে, “পূর্ব বা পশ্চিমমুখী হওয়ার মধ্যে কোনো পুণ্য নেই” । দ্বিতীয় অংশে একই আয়াতের ব্যাখ্যা করা হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাথে সম্পর্কিত পাঁচটি বিষয়ের উদাহরণ দিয়ে। তাফসীরবিদরা এই আয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (রাঃ) প্রতি সত্যিকারের, নিখাদ ভালোবাসা ছাড়া ঈমান ও ইবাদত কোনোটাই শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে না। আব্বা প্রায়শই বলতেন, “আল্লাহর কাছে ইবাদত মনজুর হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে রাসূলে পাকের (সাঃ) প্রতি মহব্বত।

ইবাদতের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন ও তার নৈকট্য লাভের চেষ্টা। যুগে যুগে সুফী সাধকরা এই নৈকট্য লাভের চেষ্টাই করে গেছেন নীরবে। ঐশী প্রেমের আলোয় ভরিয়ে রেখেছেন নিজেদের জীবন, আলোকিত করেছেন তাদের সংস্পর্শে আসা অগণিত মানুষকে। পার্থিব জীবনের অর্জনকে তুচ্ছ ভেবে অন্তহীন জীবনের সঞ্চয়কে লক্ষ্য করেই জীবন অতিবাহিত করেছেন। পার্থিব জীবনের সব দায়িত্ব পালন করেও তারা সীমাবদ্ধ জীবনকে অসীম করে তুলেছেন নিজেদের কর্ম ও আরাধনায়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে ওই উচ্চতায় হয়তো কখনোই পৌঁছা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষণজন্মা এসব মানুষদের কর্ম ও আদর্শের অনুসরণ আমাদের আত্মিক উন্নয়নের পথকে আরো আলোকিত করে তুলতে পারে। আমার বাবা সৈয়দ হাসান ইমাম হোসাইনী চিশতী (আউলিয়া) ছিলেন এরকমই এক প্রদীপ্ত প্রদীপ। যে প্রদীপের আলোয় আমাদের জন্ম, বেড়ে উঠা ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা, সেই প্রদীপ আজ আর নেই। অনির্বাণ জ্যোতি ছড়িয়ে রেখে সেই প্রদীপ এখন মহাবিশ্বের সকল আলোর স্রষ্টার মাঝে বিলীন। দুনিয়ার প্রদীপ নিভে গেলেও এই শাশ্বত প্রদীপের আলো কখনো নিভে না। প্রার্থনা করি, জীবনভর কুরআন, হাদিস, তাফসীর চর্চায় ডুবে থাকা, ‘ইশকে রাসুলে (রা:) এবং ইশকে আহলে বায়েতে’ নিমগ্ন এই বুজুর্গকে পরম করুনাময় আল্লাহপাক জান্নাতের সর্বোচ্চ মোকামে অধিষ্টিত করুন।

সৈয়দ মসিউল হাসান
দরবার-এ- মোস্তফা
সুলতানসী হাবেলী
হবিগঞ্জ।

 

মন্তব্য

  • এই মহান মনিষী আর এই অধমের মধ্যে বাদ-সওয়ালের সর্বশেষ স্মৃতিময় ক্যানভাস এ ছবি; নিরন্তর জাগরূক। প্রসঙ্গ ছিলঃ আমাদের এই সংগঠনের মত আর কোন কোন সংগঠন তিনি সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবকে নিয়ে গঠন করেছিলেন।
    হায়! জান্নাতিরা চলে যান জান্নাতে আর আমি পসার মেলে বসে থাকি মৃতের বাজারে!

  • এই মহান মনিষী আর এই অধমের মধ্যে বাদ-সওয়ালের সর্বশেষ স্মৃতিময় ক্যানভাস এ ছবি; নিরন্তর জাগরূক। প্রসঙ্গ ছিলঃ আমাদের এই সংগঠনের মত আর কোন কোন সংগঠন তিনি সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবকে নিয়ে গঠন করেছিলেন।
    হায়! জান্নাতিরা চলে যান জান্নাতে আর আমি পসার মেলে বসে থাকি মৃতের বাজারে!

    • মোস্তফা কামাল চাচা আব্বার অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। চাচাও আব্বাকে বড় ভাইয়ের মতোই শ্রদ্ধা করতেন। লেখালেখির উৎসাহের জন্য উনি ছিলেন আব্বার এক নিরন্তর উৎস. মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ ও শুভাশীষ।

      • জ্বি, ছবিতে ধারিত উনার আলাপচারিতার যাবতীয় বিষয়-বস্তোই ছিল তাঁরা দুজনের কর্মময় স্মৃতিচারণ। জেনেছিলাম, সিপাহসালার ডাইন্যাস্টি সংক্রান্ত যাবতীয় সংগঠনেই উনাকে বানানো হতো প্রেসিডেন্ট এবং কামাল সাহেবকে বানানো হতো সেক্রেটারী।
        মহান আল্লাহ তায়ালা উভয়কেই ডেকে নিয়ে গেছেন তাঁদের চীরস্থায়ী আলয়ে- এদিকে আজ আমরা হিংসা আর মাৎসর্য্যের দাবানলে হয়ে আছি দিশাহারা। ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহিরাজেউন।

      • জ্বি, ছবিতে ধারিত উনার আলাপচারিতার যাবতীয় বিষয়-বস্তোই ছিল তাঁরা দুজনের কর্মময় স্মৃতিচারণ। জেনেছিলাম, সিপাহসালার ডান্যাস্টি সংক্রান্ত যাবতীয় সংগঠনে উনাকে বানানো হতো প্রেসিডেন্ট এবং কামাল সাহেবকে বানানো হতো সেক্রেটারী।
        মহান আল্লাহ তায়ালা উভয়কেই ডেকে নিয়ে গেছেন তাঁদের চীরস্থায়ী আলয়ে- এদিকে আজ আমরা হিংসা আর মাৎসর্য্যের দাবানলে হয়ে আছি দিয়েহারা। ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহিরাজেউন।

  • জ্বি, ছবিতে ধারিত উনার আলাপচারিতার যাবতীয় বিষয়-বস্তোই ছিল তাঁরা দুজনের কর্মময় স্মৃতিচারণ। জেনেছিলাম, সিপাহসালার ডান্যাস্টি সংক্রান্ত যাবতীয় সংগঠনে উনাকে বানানো হতো প্রেসিডেন্ট এবং কামাল সাহেবকে বানানো হতো সেক্রেটারী।
    মহান আল্লাহ তায়ালা উভয়কেই ডেকে নিয়ে গেছেন তাঁদের চীরস্থায়ী আলয়ে- এদিকে আজ আমরা হিংসা আর মাৎসর্য্যের দাবানলে হয়ে আছি দিয়েহারা। ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহিরাজেউন।

  • সৈয়দ হাসান ইমাম হোসাইনী চিশতী রহ. (আওলিয়া) ভাইজান ছিলেন আমাদের বটবৃক্ষ।এই অভিভাবকহীনতা পূর্ণ হওয়ার নয়,,,, আধ্যাত্মিকতা সহ বাংলা,ইংরেজি, আরবী,উর্দু ও ফার্সি ভাষায় যে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব ছিলেন তা তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখানি ও গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ রেখে গেছেন।আল্লাহ পাঁক ভাইজানের মাকাম বৃদ্ধি করুন,,,, আমিন।।

মতামত দিন