প্রবন্ধ

ছাকীফা-ই-বনু ছায়িদায় ধমক দিয়া ছালা কাড়িয়া লইয়াছে,সেজন্য কুরাআনী ঘোষনাও অবহেলিত।

হারাম হালাল বাছ-বিচার না করিয়া যেকোন কিছু গলাধঃকরন করায় যাহারা পেটের অসুখে অসার ও কৃশ হইয়া মৃত্যুমুখী হইয়াছে,তাহাদের পেটে অসুখের দাওয়াই প্রয়োগের আগেই পুষ্টিকরের উপর পুষ্টিকর পথ্য খাওয়াইতে থাকিলে কি আর তাহাদের মৃত্যু ঠেকান যাইবে? বরং ঐ পুষ্টিকর খাদ্যে তাহাদের আরো তাড়াতাড়ি মৃত্যু ঘটিবে।কারন উহা হযম করিবার পরিপাক-যন্ত্রই তাহাদের গড়বড় হইয়া রহিয়াছে।মুসলমানেরও পরিপাক-যন্ত্রের গোলমাল হইয়া রহিয়াছে হযরত রসুল (সাঃ)-এর ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার আদর্শ- ত্যাগে।অনমনীয় আদর্শই ছিল সক্ষম পরিপাক-যন্ত্র।মুসলমানের জীবনে স্বাধীনতা বা অন্য কোনো নিআমতে কাজ হইতেছে না।’জ্ঞান মহানগরীর তোরণ’ আলী (আঃ)-কে যখন শেষবার খলিফা হইবার জন্য চাপিয়া ধরা হয়,তখন তিনি ঐ রোগের মূল কথা বলিয়াছিলেন নিন্মের বক্তব্যেঃ “বরং তোমরা আমাকে ছাড়িয়া দাও,তোমাদের খলিফা করিবার জন্য আমি তেমন একজনকে বাছিয়া দেই,তোমরাও তাহাকে সাহায্য কর;আমিও আগের মতো তাহাকে সাহায্য করি।কারন ইতোমধ্যে সত্য ও ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্নমুখী ধারণা পরিবেশিত হইয়া গিয়াছে।আমি প্রকৃত সত্য ও প্রকৃত ধর্ম কখনো ছাড়িতে পারিব না।তোমরা তাহাকে কঠিন মনে করিয়া আমার পিছে দাঁড়াইয়াটিকিতে পারিবে না। ” ( নাহযুল বালাগাহ )।

কিন্তু আলী (আঃ)-এর উপর আল্লাহর কসম দিয়া তাহারা খিলাফত তাঁহার হাতে গছাইয়া দিয়াছিল।তাহারা কিন্তু তাহার পর টিকিতে পারে নাই। সত্য ও ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্নমুখী ধারণা যে হযরত রসুল (সাঃ)-এর ওফাতের ২৩ বছরের মধ্যে পরিবেশিত হইয়া গিয়াছিল,মুসলমান সমাজের কেউ সৃজনমুখী কাজে অগ্রসর হইলেই সেই সব ধারনার যেকোনো একটির সাহায্যে সৃজনশীল প্রতিভাকে দাবাইয়া দেওয়া হয়।কাজেই,ঐভাবে সত্য- প্রকাশেও বাধার সৃষ্টি করা হয়।আল্লামা আবুল ফজল মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ আব্বাসী লিখিয়াছেনঃ “নবী করিম (সাঃ)- এর প্রতিষ্ঠিত জীবনাদর্শ হইতে অভিজাত- শ্রেনী আগেই বিচ্যুত হইয়াছিলেন।যে সকল লোক অনেক পরে অবস্থানগতিকে বাধ্য হইয়া দ্বীন ইসলাম কবুল করিয়াছিল।তাহারাই সকলের আগে দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা লুটিবার আশায় আঁধার যুগের গ্লানিভরা অর্থলিপ্সায় ডুবিয়া গিয়াছিল ইসলামের প্রলেপ লাগাইয়া তাহারা ইসলামবিরোধী কাজে ডুবিয়া যাইতেছিল।” -(খিলাফতের ইতিহাস,পৃঃ-৮৭,ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)।

আসল সত্য ও আসল ধর্ম পিছে ফেলিয়া সত্য ও ধর্মের অন্যরূপ ব্যাখ্যা সৃষ্টি ঐ ইসলামের প্রলেপ লাগাইবার জন্যই তাহাদের প্রয়োজন পড়িয়াছিল।হযরত আবু বকর খলিফা হইবার অব্যবহিত পূর্বের ভাষনে ইসলাম বা মুমিন, এমনকি মুসলমানের উল্লেখ না করিয়াই যখন আরবদের প্রাধান্য দিয়া এবং আরবদের মধ্যে কুরায়শদের প্রাধান্য দিয়াই তাহাদের জন্য এই সুযোগ করিয়া দিয়াছিলেন,তখন হইতে ঐ ভাব- ধারার সৃষ্টি ।‘যুব সমাজের ধর্মবিমুখতা’ নামক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ হইতে প্রকাশিত শামসুল আলম প্রনীত পুস্তকে লেখক ‘ইসলামপন্থীদের ইসলাম-বিচ্যুত এবং ভ্রান্তিই যুবকদের ধর্মবিমুখতার অন্যতম প্রধান কারন।’প্রথম দিকে বলিয়াই এক স্থলে বলিয়াছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আল-কুরানে ঘোষনা করেছেন,ধনীদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদে রয়েছে মিঃস্ব সর্বহারাদের সার্বজনীন অধিকার।” অন্যস্থলে বলিতেছেন,পাকিস্তান যুগে ইসলামপন্থীদের প্রায় সবাই সাধারণভাবে ছিলেন শোষকদের পক্ষে।” পাকিস্তান যুগের ইসলামপন্থীদিগকে যদি ‘ইসলামপন্থী’ই বলা হয় বিষম মুনাফিক বলা না হয়,তবে তাহারা কেমন করিয়া আল্লাহ তাআলার আল-কুরআনী ঘোষণাটি হইতে বিচ্যুত হইল,কোথা হইতে বিচ্যুত হইল,কোথা হইতে ‘শোষকের পক্ষে’ থাকিবার আদর্শ পাইল?আসলে পাকিস্তানের জনসাধারণের ভালায়ীর জন্য যাহাদের দরদ রহিয়াছে দেখা গিয়াছে,তাহাদের কাহাকেও হত্যা করিয়া,কাহাকেও পাগল করিয়া,কাহারো প্রতি ফতোয়ার লগুড় প্রয়োগ করিয়া,কাহারো মুখে গামছা পুরিয়া দিয়া,(আর যাহারা চিৎকার করিত, তাহারা গদ্দীর লোভে- যে গদ্দী রাখার ক্ষমতা তাহাদের নাই- চিৎকার করিত, তাহাদের হাতে গদ্দী গেলেও তাহাদের দ্বারা জনসাধারণের কোনো উপকার হইবে না বলিয়া তাহাদের হাত হইতে গদ্দী নিতে বেশিদিন লাগিবে না বলিয়া তাহাদের সঙ্গে গোপনে রফা করিয়া সাইক্লিক অর্ডারে পাকিস্তান লুটতরাজ করিতে অসুবিধা হইবে না ভাবিয়া) শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত-রা মুখে ইসলামের নাম করিয়া চুটিয়া মুনাফেকী করিয়াছে।বোধ হয় সেদিকে তাহাদেরও যুক্তি আছে।তবে সেই সব যুক্তি আল্লাহ-রসুল বা নবীবংশ হইতে নিঃসৃত নয়।নবীবংশ ও কোরআন যে একে অপরকে কখনো ছাড়িবে না’ তাহা আদি হাদী রসুলুল্লাহ উল্লেখ করা সত্ত্বেও মুনাফিকেরা তাহার সমান্তরাল দেখাইবার জন্য এমন একটি হাদিস উদ্ভাবন করিয়াছে তাহার বিরুদ্ধে Authenticity-র প্রশ্ন সঙ্গীন থাকিলেও গায়ের জোরে ধমকের চোটে মুনাফিকেরা নবীবংশ হইতে ক্ষমতা কাড়িয়া (ছাকীফা-ই-বনু ছায়িদায় ধমক দিয়া ছালা কাড়িয়া) লইয়াছে,যাহাতে তাহাদের দিক হইতে বনু মনোযোগ নবীবংশের দিকে না যায়,সেজন্য ম্যুতেবার হাদিসটির উল্লেখ হইতেও দেওয়া হয় না। সেজন্য কুরাআনী ঘোষনাও অবহেলিত।
আল্লাহ রসুলের হুকুম তাঁহাদের মুখের উপর ছঁড়িয়া মারিয়া আল্লাহ-রসুলের কথা অবহেলা করিবার সাহস রসুলের কালেই লোকের মধ্যে বাড়াইয়া দিয়াছিল,হাদিসবক্তা সাহাবাগনকে কয়েদ করিয়া ক্ষমতাসীনেরা হাদিস আলোচনা বন্ধও রাখিয়াছে।-(তাজাকিরাতুল হুফফাজ; পৃঃ-১৪৯)।

অধ্যাপক মুফাখখারুল ইসলামের রচিত গবেষণামূলক গ্রন্থ  “ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য ” থেকে সংগৃহীত।


সিপাহসালার ইনস্টিটিউশন | সেপ্টেম্বর ২০২০এস এইচ হক

মতামত দিন