প্রবন্ধ

আজ ২৫ শাওয়াল নবী বংশের নক্ষত্র ইমাম জাফর সাদিক (আ.)এর শাহাদাত দিবস

আজ ২৫শে শাওয়াল নবী বংশের নক্ষত্র ইমাম জাফর সাদিক (আ.)এর শাহাদাত দিবসে সকল অনুসারীদেরকে জানাই আন্তরিক শোক ও সমবেদনা।


ইমাম জাফর সা‌দেক অালাই‌হিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু অালাই‌হি ওয়া অা‌লেহী ওয়া সাল্লা‌মের অাহ‌লে বাই‌তের ষষ্ঠ ইমাম ছি‌লেন। তিনি ৮৩ হিজরী‌র ১৭ র‌বিউল অাউয়াল মদীনায় অাগমণ ক‌রেন এবং ১৪৮ হিজরী‌র ২৫ শাওয়াল অাব্বাসী খ‌লিফা মনসুর দাওয়া‌নেকীর বিষে শহীদ হন। জান্নাতুল বাকী‌কে তাঁকে দাফন করা হয়।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)ইসলামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ও এ ধর্মকে সাংস্কৃতিক বা চিন্তাগত হামলাসহ সার্বিক ক্ষতিকর দিক থেকে সুরক্ষার জন্য যা যা করার দরকার তার সবই তিনি করেছিলেন। আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, নিকৃষ্ট, প্রতিহিংসাপরায়ণ খলিফা ছিল মানছুর। মানছুর ইমামকে খুব কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছিল। তাঁর পিছনে গোয়েন্দা লাগানো হয়েছিল। ইমামের প্রতি জন সমর্থন মানছুরের হিংসার কারণ ছিল। ইসলামী ভূখণ্ডগুলোতে ইমাম জা’ফর সাদিক (আ.)’র ইমামতের প্রভাব ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় ভীত-সন্ত্রস্ত আব্বাসিয় জালিম শাসক মানসুর দাওয়ানিকি বলেছিল:

“জাফর ইবনে মুহাম্মাদ যদিও তরবারি দিয়ে সংগ্রাম করছেন না, কিন্তু তার পদক্ষেপগুলো আমার কাছে একটি অভ্যুত্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বলে মনে হয়।”

দাওয়ানিকির নির্দেশে ইমাম জা’ফর সাদিক (আ.)কে শহীদ করা হলেও শাহাদাতের পর ইমামের নুরানি ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য বহুগুণ বেড়ে যায়।৬৫ বছর বয়স্ক ইমামের লাশ দাফন করার সময় ইমাম প্রেমিক আবু হুরাইরা আজালি নিজেকে বলছিলেন:

‘তুমি কি জান কোন মহামানবের লাশ নিয়ে যাচ্ছ মাটি দিতে? তাঁর আগে ও পরে যদি ইমাম না থাকত তাহলে অবশ্যই বলতাম, কাল কিয়ামত পর্যন্ত এ পৃথিবী এমন মহামানব তৈরিতে অপারগ।’

ইমামের সামনে বিশ্বনবী (সা.)’র নাম উচ্চারিত হলে তাঁর চেহারার রং পাল্টে যেত। হজের ইহরাম বাধার পর ইমাম আল্লাহর ভয়ে এতটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন যে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক শীর্ষক তালবিয়া উচ্চারণকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করতেন।ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে অসংখ্য কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা দেখা গেছে এবং প্রসিদ্ধ অনেক মুকাশাফা (অন্তরে আধ্যাত্মিকভাবে প্রতিফলিত অদৃশ্য জগতের সত্য ঘটনাগুলো) বর্ণিত হয়েছে।

যুগে বনী উমাইয়্যা ও বনী আব্বাস শাসকচক্রের প্রতিপালিত ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত মিথ্যাবাদী রাবীরা (বর্ণনাকারীরা) মহানবী (সা.)-এর নামে মিথ্যা ও জাল হাদীস বর্ণনা ও প্রচার করত, আর এ রকম এক যুগসন্ধিক্ষণে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) মহানবীর দিশাহারা উম্মতের সামনে মহানবীর সত্য ও বিশুদ্ধ (সহীহ) হাদীস ও সুন্নাহ উপস্থাপন করেছিলেন এবং ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ৪০০০ শিষ্য, মুহাদ্দিস (হাদীসশাস্ত্রবিদ), মুফাসসির, মুতাকাল্লিম (কালামশাস্ত্রবিদ), রাবী (হাদীস বর্ণনাকারী) ফকীহ-মুজতাহিদকে তি‌নি দীর্ঘ‌দিন মস‌জি‌দে নববী‌তে তাফসীর, হাদীস, কালাম, ফেকাহ, ইরফানসহ অন্যান্য বিষ‌য়ে দারস দি‌য়েছেন।তাই মহানবীর সত্য হাদীস ও সুন্নাহ বর্ণনা করার জন্য তাঁকে ‘সাদিক’ বা ‘সাদিকু আলে মুহাম্মাদ’ (হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর আহলে বাইতের সত্যবাদী) বলা হয়, যদিও মহানবী (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইতের সকল ইমাম সত্যবাদী ছিলেন। ইমাম জাফর আস-সাদিকের অক্লান্ত চেষ্টা-প্রচেষ্টার কারণে মহানবী (সা.)-এর হাদীস ও সুন্নাহ এবং তাঁর আহলে বাইতের অমিয় বাণী তথা খাঁটি ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান সংরক্ষিত হয়েছে।  বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, মহানবী (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইতের সকল বাণী ও হাদীস হচ্ছে হেদায়াতের নূর (সঠিক পথ প্রদর্শনের আলো) এবং প্রাণ-সঞ্জীবণী সুধা।

ফিক‌হে ইসলামীর ক্ষে‌ত্রে ইমাম জাফর সা‌দেক অালাই‌হিস সালা‌মের অবদান অনন্য। ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) মুসলমানদের সব মাজহাবের কাছেই বরেণ্য ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তাঁর আদর্শ হতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূত্র। উল্লেখ্য অাহ‌লে তাশাইয়্যুর মূলধারা, যারা জাফরী না‌মে প‌রি‌চিত তাদের ফেকাহ ইমাম জাফর সা‌দেক অালাই‌হিস সালাম থে‌কে। অার অাহ‌লে সুন্নাহর ফিক‌হের ইমাম হযরত ইমাম অাবু হা‌নিফা রহ. ও ইমাম মা‌লেক রহ. সরাস‌রি তাঁর ছাত্র এবং ইমাম অাহমদ রহ. ও শা‌ফেয়ী রহ.ও পরোক্ষ ছাত্র অর্থাত  ছা‌ত্রের ছাত্র ছি‌লেন।

তাঁর সম্প‌র্কে ইমাম অাবু হা‌নিফা রহ.-এর প্র‌সিদ্ধ উ‌ক্তি :

«لولا السنتان لهلك النعمان»

য‌দি না হ‌তো সেই দুবছর, নোমান(আবু হানিফা) ধ্বংস হ‌য়ে যে‌তো।

আবু হানিফা বলতেন,সেই দুই বছরে আমি যা শিখেছি সারা জীবনেও আমি ততটা শিখতে পারিনি।এখা‌নে সেই দুবছর বল‌তে তি‌নি যে দুবছর ইমাম জাফর সা‌দেক অালাই‌হিস সালা‌মের নিকট শিক্ষা লাভ ক‌রে‌ছেন সেই দুবছর‌কে বোঝা‌নো হ‌য়ে‌ছে।আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মাজাবী ইমাম আবু হানিফা ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র কাছে শিক্ষা অর্জন করায় নিজেকে গর্বিত মনে করতেন। তিনি এই দুই বছরকে ফিকাহ শাস্ত্রের ওপর তার জ্ঞান অর্জনের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করতেন।তিনি আরো বলেছেন,-

“আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদের (তথা ইমাম জা’ফর আস সাদিক আ.) চেয়ে বড় কোনো ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদ ও জ্ঞানী ব্যক্তি দেখিনি। তিনি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি।”

মালিকি মাজহাবের ইমাম মালেক বিন আনাস ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) সম্পর্কে বলেছেন,-

আল্লাহর শপথ! মানুষের কোনো চোখ সংযম সাধনা, জ্ঞান, ফজিলত ও ইবাদতের ক্ষেত্রে জা’ফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে বড় কাউকে দেখেনি, কোনো কান এসব ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বড় কারো কথা শুনেনি এবং কোনো হৃদয়ও তা কল্পনা করেনি।

সাইয়্যেদ মির আলী হিন্দি ইমাম জাফর সাদিক (আ) সম্পর্কে (তারিখুল আরাব বইয়ের ১৭৯ পৃষ্ঠা) বলেছেন,-

‘তিনি দিগন্ত প্রসারী চিন্তাশক্তি ও দূর-দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। তিনি তাঁর যুগে প্রচলিত জ্ঞানসমূহের সকল শাখায় পূর্ণ জ্ঞান রাখতেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ অর্থে ইসলামে দর্শন শিক্ষার গোড়া পত্তন করেন। যারা ইসলামে ফিকাহ শাস্ত্রের বিভিন্ন মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন কেবল তারাই তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেননি বরং দর্শন শিক্ষার্থী ও দার্শনিকরাও ইসলামী বিশ্বের দূর দূরান্ত থেকে তাঁর ক্লাসে উপস্থিত হতেন।’

উমাইয়া খেলাফতের শেষের দিকে ও আব্বাসীয় খেলাফতের প্রথম দিকে তারা উভয় পক্ষ একে-অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল থাকায় ইমাম সাদিক (আ.)’র হাতে ছিল মুক্ত সময়। এ সময় ইমামের জ্ঞান-আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে এবং মদীনার আলেমরাসহ হাজার হাজার মানুষ নানা বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা অর্জন করতে থাকেবিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী এবং রসায়নবিদ ও গণিতবিদ জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’রই ছাত্র। ইমামের জ্ঞান কেবল দ্বীনী বিষয়ের মধ্যেই সীমিত ছিল না। তিনি রসায়ন, পদার্থ, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়েও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।বিখ্যাত ফকিহ মুহাম্মাদ বিন মুসলিম ও যুরারেহ, কালাম শাস্ত্রবিদ ও দার্শনিক হিশাম, আধ্যাত্মিক শাস্ত্রের বিশিষ্ট পণ্ডিত মুফায্যাল ও সাফাওয়ান, জগত-বিখ্যাত পণ্ডিত  ব্যক্তিত্বরা গড়ে উঠেছিলেন ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ‘র জ্ঞানের স্পর্শে। এছাড়াও বায়েজীদ বোস্তামী, হাসান বসরী, ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের মতো বিশ্ববিশ্রুত মনীষীরা ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে নিজেদের ধন্য করেছেন।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) যে মহাসাগরের মত অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা ছিল নবুওতী জ্ঞানেরই উত্তরাধিকার। তাই ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলতেন,-

“আমার বক্তব্য আমার বাবা ইমাম বাকের (আ.)’র বক্তব্য, তাঁর বক্তব্য আমার দাদা ইমাম জাইনুল আবিদীন (আ.)’র বক্তব্য, আমার দাদার কথা আমীরুল মুমিনিন হযরত আলীরই কথা (আ.) এবং তাঁর বক্তব্য হচ্ছে রাসূল (সা.)’রই বক্তব্য, আর রাসূলে খোদা (সা.)’র বক্তব্য হচ্ছে মহান আল্লাহরই বক্তব্য।”

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছিলেন,-

”আমাদের তথা রাসূল (সা.)’র আহলে বাইতের কাছে রয়েছে ভবিষ্যতের জ্ঞান, অতীতের জ্ঞান ও অন্তরে সঞ্চারিত খোদায়ি জ্ঞান তথা ইলহাম। আমরা শুনতে পাই ফেরেশতাদের বাণী, আমাদের কাছে রয়েছে রাসূল (সা.)’র অস্ত্রসমূহ এবং আহলে বাইতের সদস্য ইমাম মাহদী (আ.)’র কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত সেগুলো আমাদের হাতছাড়া হবে না। আমাদের কাছে রয়েছে হযরত মূসার তৌরাত, হযরত ঈসার ইঞ্জিল, হযরত দাউদের যাবুর এবং মহান আল্লাহর পাঠানো অন্যান্য আসমানি কেতাব।”

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আরো বলেছেন,-

“আমাদের কাছে রয়েছে হযরত ফাতিমার সহিফা যাতে রয়েছে সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনার বিবরণ এবং এমনকি পৃথিবীর শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত সমস্ত শাসকের নামও তাতে লেখা আছে। আমাদের কাছে রয়েছে ‘আল জামী’ নামের দলীল, সত্তুর গজ দীর্ঘ ঐ দলীলে লেখা রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র বাণী এবং ঐসব বাণী আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) নিজ হাতে লিখেছিলেন। আল্লাহর শপথ! এতে রয়েছে মানুষের জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সবকিছু।”

ইমাম জাফর সাদিক (আ)’র শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আরও একবার গভীর শোক ও সমবেদনা।

“আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মদ ওয়া আলে মুহাম্মদ”।

 

সৈয়দ হোসাইন উল হক,এমফিল,ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি,অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি।

মতামত দিন