ধর্মীয় ইতিহাস প্রবন্ধ

সাহাবীগনের মান ও অবস্থান

আমাদের রসুলুল্লাহ সঃএর সাহাবীদের সবাই একই মানের ছিলেন না। আহলে বাইতের অনুসারী সাহাবীও ছিলেন। এটি চক্রান্তের ফলস্বরূপ প্রচারণায় আসেনি। যেমন রসূল সঃ এর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং পরহেযগার সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী রাঃ, হযরত সালমান ফারেসী রাঃ, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাঃ (যার ব্যাপারে রসূল সঃ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে আম্মার বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হবে এবং তা পরবর্তীতে সিফফীনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার হাতে বাস্তবায়িত হয়), হযরত মিকদাদ রাঃ ও হযরত বেলাল রাঃ এদের মত আর কেউ আছে কি যারা ইসলামের জন্য তাদের চেয়েও বেশি ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন? তবে কেন রসূল সঃএর ওফাতের পর উক্ত সাহাবীদের তেমন কোন প্রভাবই লক্ষ্য করা যায় না বা তাদের প্রচারই বা এত কম কেন?

সাহাবীদের মধ্যে একটি বিভক্তির সৃষ্টি হয় রসূল সঃএর ওফাতের কয়েকদিন আগে থেকেই। এর শুরুটা হয়েছিল রসুলের বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে গাদেরে খুম নামক স্থানে একটা ঐতিহাসিক খুদবাহ’র পর থেকেই, যে খুদবায় রসুল সঃ তাঁর অবর্তমানে আলী আঃকে তাবৎ মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক তথা মাওলা তাঁর নিজের স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করেছিলেন। তারপর রসুলের ইন্তেকালের অপব্যাবহিত আগের বৃহস্পতিবারের রাত্রি, যে রাত্রির কথা স্মরণ করে হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ এমন ভাবে কাঁদতেন যে তার অশ্রু জমিন পর্যন্ত গড়িয়ে পড়তো এবং বলতেন হায় বৃহস্পতিবার! এ রাতেই ইসলাম ধ্বংস হয়ে গেলো?

কি এমন ঘটনা সে রাত্রে ঘটলো যে কারণে ইবনে আব্বাস রাঃ ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা করলেন? প্রিয় পাঠক, ঘটনাটি হাদিস সংকলক বুখারী কাটছাট করেছেন এবং বক্তব্য পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু মুসলিম শরীফে বিস্তারিতই রয়েছে।

বুখারী,কিতাবুল জিহাদ-২৯৩৩+৪০৮৫,৪০৮৬নং হাদিস এবং মিশকাত, ১১তম খন্ড-৫৭১৪নং হাদিস থেকে এটাই পরিস্কার যে সেই রাতে রসূল সঃএর বিরুদ্ধাচারণ এবং তাঁর উপর প্রলাপ বকার অপবাদ আরোপের মাধ্যমে যারা তাঁর ইন্তেকালের আগে তাঁকে কষ্ট দিয়েছিলেন, ঠিক তাদের বিপরীতে সত্যপন্থী রসূল প্রেমিক সাহাবীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন। ফলে ঘরের মধ্যেই বাদানুবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে রসূল সঃ রাগান্বিত হয়ে তাঁর উপ অপবাদ আরোপকারীদের সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেন এবং একবুক কষ্ট নিয়ে বলেন তোমরা আমাকে যে দিকে আহ্বান করছ (অর্থাৎ পাগল হওয়ার অপবাদ) তা থেকে আমার রব আমাকে পবিত্র রেখেছেন।

ইসলামের ইতিহাসের কালো রাত্রি হিসেবে পরিচিত এ বৃহস্পতিবার রাত্রের এ ঘটনার মূল বিষয়বস্তু কি ছিল এবং এ কলঙ্কজনক ঘটনার মূল নায়ক কে বা কারা ছিল তা না জেনেই যারা ইসলাম বুঝতে চায় তাদের পক্ষে সিরাতে-মুস্তাকীমের পথ পাওয়া সম্ভব নয়।

আহলে বাইত এবং তাদের অনুসারী সাহাবীরাই ছিলেন খাঁটি মুমেন-মুসলমান। আহলে বাইতকে ভালবাসার পর অর্থাৎ আহলে বাইতের পরিচয় ও মর্যাদা জানার পরও কি তাদের প্রতি ভালবাসা অন্তরে অবশিষ্ট থাকে যারা আহলে বাইতের দুশমন ছিল? যারা নবীর বংশকে চিরতরে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রে মাতাল ছিল। যার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা কারবালায় দেখতে পাই। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে এটা বুঝা কঠিন হবে না যে, বৃহস্পতিবার, সিফফীন, জঙ্গে জামাল এবং কারবালা সবই একই সুতোয় গাঁথা।

সুতরাং পবিত্র আহলে বাইতের সাথে যাদের শত্রুতার সম্পর্ক ছিল এবং যাদের প্রতি আহলে বাইত আঃগণ অসন্তুষ্ট ছিলেন তারা ক্ষমতা দখল করে নিজেদের মত করে যতই উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হোক না কেন আল্লাহর কাছে ভয়ঙ্কর বিপদ ছাড়া এদের জন্য আর কিছুই নেই।

আমরা জানি নারীকূল শিরোমণি হযরত ফাতেমা সাঃ কারো কারো প্রতি কোন কারণে অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগ পর্যন্ত তাদের সাথে কথা বলেননি। তিনি হযরত আলী আঃকে ওছিয়ত করে গিয়েছিলেন যাতে তাঁকে রাতের অন্ধকারে গোপনে জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করা হয় যেন যাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন তারা যেন তাঁর জানযায় পর্যন্ত অংশগ্রহণ না করতে পারে। (বুখারী. অধ্যায় কিতাবুদ জিহাদ-২৮৬৩)

এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি পরবর্তীদের জন্য একটি রহস্য রেখে গেলেন যাতে তা উদঘাটনের মধ্যেই মানুষ সত্য খুজে পায়। পাঠক, রসূল সঃএর এই হাদিসটি লক্ষ্য করুন “ফাতেমা আমার দেহেরই অংশ, যে ফাতেমাকে কষ্ট দেয় সে আমাকেই কষ্ট দেয়”। (বুখারী,কিতাবুন মানাকিব,হাদিস নং-৩৪৪১)।

তাই সত্যপ্রেমিকদের জানতে হবে কারা ফাতেমা সাঃকে কষ্ট দিয়েছে। এসব ঘটনার মাধ্যমে আশা করি সাহাবীদের ব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তবে এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যেহেতু ইতিহাসের অনেক ঘটনাই ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হয়নি, সেহেতু মানুষ তা জানতে পারলে প্রকৃত সত্য উম্মোচিত হবে, তাই মানুষ যাতে ঐ সত্য ঘটনাগুলো না জানতে পারে অথবা জানার চেষ্টাও যাতে না করে সেজন্য বিভিন্ন মিথ্যা প্রচার এবং রসূল সঃএর নামে হাদিস বানিয়ে মুসলিম উম্মাহকে ভীত বিহ্বল করে রাখা হয়েছে এই বলে যে, সাহাবীদের নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না, বললে ঈমান থাকবে না ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।

যেহেতু দ্বন্দ্ব নিশ্চিত সেহেতু নিজেকে রক্ষার প্রচেষ্টা কে না করে? যদিও সত্যবাদীর জন্য তার সত্যবাদিতাই যথেষ্ট। তাই বলে মিথ্যাবাদী কি বসে থাকে? তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যত প্রকার মিথ্যার ও কৌশলের আশ্রয় প্রয়োজন, তার সবই সে গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় সত্যেরই হয়। এ বাস্তবতাকে অবশ্যই সামনে রাখা অবশ্যই আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।

পাঠক, আজ এ পর্যন্তই, খোদা হাফেজ- @sat

মতামত দিন