প্রবন্ধ

শত বছরের ঐতিহ্যঃ পবিত্র মহররমের শোকানুষ্টান সুরাবই সাহেব বাড়ি,হবিগঞ্জ।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মােহাম্মদ (সঃ) এর প্রাণ প্রিয় দৌহিত্র এবং হযরত আলী (আ:) এর দ্বিতীয় পুত্র ইমাম হুসায়েন (আ:) এর পরিবারের সদস্য মােট বাহাত্তর জন মােমিন বান্দাহ ফোরাত নদীর তীরে এক বিন্দু পানির জন্যে পিপাসায় কাতর হয়ে কারবালার ধু ধু মরু প্রান্তরে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।এই অসম যুদ্ধে ইমাম হুসাইন (আ:) এর কাফেলায় ছিল মাত্র বাহাত্তর জন এবং অপর পক্ষে এজিদের সেনা বাহিনীতে ছিল হাজার হাজার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈনিক। এ অসম যুদ্ধে। নিশ্চিত মৃত্যু এবং পরাজয় জেনেও তারা স্বেচ্ছায় সত্যের জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ছিলেন। তবুও তারা এজিদের গভর্ণর এবং কুফার শাসনকর্তা উবায়দুল্লা বি যেয়াদের অন্যায় শর্তের কাছে মাথা নত করেননি। শর্ত ছিল, হয় এজিদের আনুগত্য স্বীকার কর নতুবা প্রাণ দাও।সত্য ও ন্যায়ের পথিকগণ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ন্যায় ও সত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন। মহররম সেই নির্মম ঘটনার স্মৃতিবাহী মাস। বর্ষ পরিক্রমায় ঘুরে আসে মহররম মাস। ঐতিহাসিক আশুরার দিন।ইসলামী বর্ষের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এই দিনটি মানব জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যবহ।

ইমামবারাহ(পাক পান্জাতন মোকাম)সুরাবই সাহেব বাড়ি,হবিগন্জ।

হবিগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রসিদ্ধ সুরাবই সাহেব বাড়ি। এই বাড়ির সৈয়দ সাহেবগণ সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রাঃ)-এর বংশধর। যিনি সাতশত বছর পূর্বে দিল্লী হতে সিলেট আগমন করেন অত্যাচারী রাজা গৌর গােবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য। তার সাথে প্রসিদ্ধ দরবেশ হযরত শাহজালাল (রঃ) এদেশে আসেন। সুরাবই সাহেব বাড়িতে প্রতি বছর মহাসমারােহে পরিপূর্ণ ধর্মীয় ভাব ও গাম্ভীর্যের সাথে শতশত বছর ধরে এখানে আনুষ্ঠানিক মহররমের অনুষ্টান ও তাজিয়া মিছিল পালিত হয়ে আসছে।মহররমের অন্যতম প্রান কেন্দ্র সুরাবই সাহেব বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা,নরপতি নিবাসী বিখ্যাত সাধক সৈয়দ গদাহাসান (রহঃ) এর ছেলের দিকে নাতি,হযরত সৈয়দ শাহ কারার ফুলশাহ মগফুর (রহ:) এখানে এসে এ বাড়ি ও ইমামবারাহ(পাক পান্জাতন মোকাম) নির্মাণ ও আনুষ্ঠানিক মহররম পালন শুরু করেন।

হযরত সৈয়দ শাহ কারার ফুলশাহ মগফুর (রহ:)’র মাজার শরীফ।সুরাবই সাহেব বাড়ির,হবিগঞ্জ।

হযরত সৈয়দ শাহ কারার ফুলশাহ মগফুর (রহ:) এখান থেকে জমিদারী দেখাশুনা করার পাশাপাশি পীর-মুরিদী করতেন ওআল্লার ইবাদতে ঐশি প্রেমে তিনি বিভোর থাকতেন।তিনি ছিলেন ছালেক মজ্জুব অলী।হযরত সৈয়দ শাহ করার (রঃ) কতিপয় অলিগণকে নিয়ে এ স্থানে বসে পরামর্শ করেছিলেন। সুরা-পরামর্শ, বই-বসা। সে থেকেই এ স্থানের নাম হয় সুরাবই। হযরত সৈয়দ শাহ করার সুতাং নদীর তীরে এক বাজার প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নামে বাজারের নাম করণ হয়। শাহজী বাজার। বর্তমান সুতাং রেল ষ্টেশনের অতি নিকটে এ বাজার অবস্থিত। শাহজী বাজার রেল ষ্টেশনের অতি নিকটে এ বাজার অবস্থিত। শাহজী বাজার রেল ষ্টেশনের নামকরনও শাহ করার নির্মিত বাজারে নাম অনুসারে হয়। মুলত এ স্থানের নাম ফতেপুর।সৈয়দ শাহ সুলেমান ফতেগাজির নাম অনুসারে নাম হয় ফতেপুর। শাহজী বাজার নামে একটি মৌজা আছে। তার জে, এল নং-১৪৩। সুতাং নদীর তীরে মনোরম ছায়া ঘেরা পরিবেশে সুরাবই সৈয়দ সাহেব বাড়ি অবস্থিত। পুরানো দেওয়াল, গেইট বাড়ির প্রাচীণত্ব বহন করছে। বাড়ির সামনে হযরত শাহ করার (রঃ)-এর মাজার শরীফ সহ রয়েছে এই বংশের বহু আওলিয়ার মাজার। এ বংশে পূর্বপুরুষের বংশ-পরম্পরায় পীর মুরিদি সিলসিলা রয়েছে।বাড়ির সামনে পাক পান্জাতন মোকাম,মসজিদ ,ও বিদ্যালয় রয়েছে।

প্রতিবছর মহা সমারোহে মহররম মাসে কারবালার নি:শংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আশুরা শোক দিবস উদযাপিত হয়ে থাকে।এ মাতমের সময় “হায় হোসাইন,হায় হোসাইন ধন্নিতে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়।মহররম মাসে চাঁদ দেখা রাত্রে ইমাম বাড়ায় আলােক সজ্জা ও নিশান উত্তোলন করা হয়।

১লা মহররম হতে প্রতি দিন ইমাম বাড়াতে ইমাম ভক্তদের জন্য শিরনি বিতরণ হয়। ভিতর বাড়িতে মহিলারা এবং ইমাম বাড়াতে পুরুষেরা জারি মার্সিয়া অনুষ্ঠান করে থাকে। এ অনুষ্ঠানে পার্শ্ববর্তী গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা যােগদান করে থাকে।

৫ই মহররম দিবাগত রাতে পুরাসুন্দা ইমাম বাড়া হতে লােকজন মিছিল সহকারে সুরাবই সাহেব বাড়ি ইমাম বাড়াতে আসে। এখানে সারা রাত ব্যাপী জারি, মার্সিয়া, মাতম অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে ৮ তারিখ রাত্র পর্যন্ত চলতে থাকে।

৯ই মহররম সকাল হতে চানপুর শ্রীরামপুর, মদনপুর, আলগাপুর, নােয়াগাঁও, নূরপুর, নসরতপুর বারলাড়িয়া, শৈলজোড়া, অলিপুর, পুরাসুন্দা, লাদিয়া, রিচি ফতেপুর এ সকল ইমাম বাড়া হতে মিছিল সহকারে সাহেব বাড়ী ইমাম বাড়াতে এসে জারি মার্সিয়া, মাতম করে পুনরায় যার যার ইমাম বাড়াতে ফেরৎ যায়।

৯ই মহররম দিবাগত রাতে এ ইমাম বাড়িতে বিরাট মজলিশের আয়ােজন করা হয়।অতঃপর এখান থেকে শােক মিছিল সহকারে পার্শ্ববর্তী ইমাম বাড়া হয়ে পরে পুরাসুন্দা ইমাম বাড়া যাওয়া হয়। সেখানে সারা রাত ব্যাপী জারি, মার্সিয়া, মাতম অনুষ্ঠিত হয়। ১০ই মহররম সারা দিন বিভিন্ন গ্রাম হতে শােক মিছিল সহকারে লােকজন এসে জড়াে হয় এবং জারি মাতম হয়।

পবিত্র আশুরার রজনীতে মজলিস

পবিত্র আশুরার রজনীতে মার্সিয়া-মাতম

আশুরা রাতের মাতম।

পবিত্র আশুরার রজনীতে মার্সিয়া-মাতম

বিকেলে তাজিয়া মিছিল উল্লেখিত ইমাম বাড়া সমূহ হতে সাহেব বাড়ির সামনে অবস্থিত সৈয়দ শাহ করার (রঃ)-এর প্রতিষ্ঠিত শাহজী বাজার (সুতরাং) এসে জড়াে হয়। এখানে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। মাগরিবের আগ পর্যন্ত জারি, মার্সিয়া, মাতম হয়ে থাকে। সে সময় এখানে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। শােকে বিহ্বল মানুষ তখন শােক মাতম আর যুদ্ধের বাজনায় বিভাের হয়ে হারিয়ে যায় সে কারবালা প্রান্তরের নৃশংস হত্যা কান্ডের স্মৃতির মধ্যে।মাগরিবের আজানের সাথে সাথে এ সকল শােক মিছিল পুনরায় নিজ নিজ ইমাম বাড়ায় ফেরৎ যায়।

তাজিয়া মিছিল

উক্ত মহররম অনুষ্ঠান যাহা ১লা মহররম হতে ১০ই মহররম পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় তাহা পরিচালনায় থাকেন-সুরাবই সাহেব বাড়ির সাহেবজাদা গন।তা ছাড়াও এ সাহেব বাড়িতে অনেকগুলাে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হযরত সৈয়দ শাহ কারার ফুলশাহ মগফুর (রহ:) বাৎসরিক ওরশ মোবারক ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ২২শে পৌষ ২৯শে পৌষ পর্যন্ত মােতাবেক জানুয়ারীর ৫ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত। এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে দেশ বিদেশ হতে অনেক ভক্ত বৃন্দ শুভাকাংখী, মানুষ আত্মীয় স্বজন যােগ দিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন,জেলা প্রশাসন হবিগঞ্জ।


সিপাহসালার | ইনস্টিটিউশননভেম্বর ২০১৯এস এইচ হক

1 Comment

  • হাশরের মাঠে নবী দ. সামনে এটাই জবাবদিহিতার এক মাত্র পন্থা,,,

মতামত দিন