উপদেশ প্রবন্ধ

দীন কি? এর প্রয়োজনীয়তাই বা কি?

 

দীন কি? এর প্রয়োজনীয়তাই বা কি?

এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হল, ইসলামী মতবিশ্বাসের যাকে পারিভাষিক অর্থে ‘দীনের মূলনীতি’ বলা হয়ে থাকে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা। ফলে ‘দীন’ (دين) শব্দটি ও এতদসম্পর্কিত অন্যান্য পরিভাষাসমূহের উপর সর্বাগ্রে সংক্ষিপ্তরূপে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। কারণ, যুক্তিশাস্ত্রের মতে কোন বিষয়ে সংজ্ঞাসমূহের স্থান সর্বশীর্ষে।
‘দীন’ একটি আরবী শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হল অনুসরণ, প্রতিদান ইত্যাদি। পরিভাষাগত অর্থে, মানুষ ও বিশ্বের জন্যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন বলে বিশ্বাস এবং এ বিশ্বাস সম্পর্কিত যাবতীয় বিধি-নিষেধ হল ‘দীন’। দীনের এ সংজ্ঞানুসারে, যারা সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী এবং সৃষ্টসমূহের সৃষ্টিকে আকষ্মিক অথবা শুধুমাত্র প্রকৃতি ও পদার্থসমূহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল বলে মনে করেন, তারা (বস্তুবাদী) বিধর্মী বলে পরিচিত। আর যারা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন, তাদের মতাদর্শ ও ধর্মানুষ্ঠানগুলো যতই বিচ্যুত ও কুসংস্কারাচ্ছন্নই হোক না কেন, তারা ধর্মাবলম্বী বলে পরিগণিত। এ মূলনীতির ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধর্মসমূহকে সত্যধর্ম ও মিথ্যাধর্মে বিভক্ত করা যায়।
অতএব সত্যধর্ম বলতে বুঝায়, ‘যে ধর্ম সত্যানুসারে ও সঠিক মতবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যে সকল আচার-ব্যবহার পর্যাপ্ত যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক ও আস্থাশীল বলে পরিগণিত সে সকল আচার-ব্যবহারের ব্যাপারে উপদেশ ও গুরুত্ব প্রদান করে।’

দীনের মৌলিক ও শাখাগত বিষয়:
দীনের পারিভাষিক ধারণার ভিত্তিতে স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিটি দীনই কমপক্ষে দু’টি অংশ নিয়ে গঠিত:
১. যে সকল বিশ্বাসের উপর দীনের মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।
২. ঐ মূলভিত্তিসমূহের ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচী বা নিয়মাবলী।
অতএব, যথার্থই বলা যায় যে, ‘মতবিশ্বাস’ হল, দীনের মূল অংশ এবং বিধি-নিষেধ হল দীনের শাখাগত অংশ। যেমন: ইসলামী পন্ডিতগণ এ দু’টি পরিভাষাকে ইসলামী মতবিশ্বাস ও বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন।

বিশ্বদৃষ্টি এবং মতাদর্শ:
বিশ্বদৃষ্টি এবং মতাদর্শ এ পরিভাষাগুলো প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে সাধারণতঃ বিশ্বদৃষ্টি বলতে বুঝায়, ‘বিশ্ব ও মানুষ সম্পর্কিত এক শ্রেণীর সামগ্রিক বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অস্তিত্ব সম্পর্কে এক শ্রেণীর সামগ্রিক বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি।’ আর মতাদর্শ বলতে বুঝায়, ‘মানুষের আচার-ব্যবহার সম্পর্কে এক শ্রেণীর সামগ্রিক মতামত।’
উপরোল্লিখিত অর্থানুসারে কোন দীনের মৌলিক ও বিশ্বাসগত বিষয়গুলোকে ঐ দীনের বিশ্বদৃষ্টি এবং দীনের সামগ্রিক বিধি-নিষেধগত বিষয়গুলোকে ঐ দীনের মতাদর্শ বলে মনে করা যেতে পারে। অনুরূপ তাদেরকে দীনের মৌলাংশ ও শাখাগত অংশ রূপে বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ‘মতাদর্শ’ পরিভাষাটি আংশিক বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সেরূপ বিশ্বদৃষ্টিও বিশেষ ও একক বিশ্বাসকে অন্তর্ভুক্ত করেনা। উল্লেখ্য, ‘মতাদর্শ’ শব্দটি কখনো কখনো সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়। তখন বিশ্বদৃষ্টিও এর অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হয়।

ঐশী বিশ্বদৃষ্টি ও বস্তুগত বিশ্বদৃষ্টি:
মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বিশ্বদৃষ্টি বিদ্যমান ছিল এবং এখনও বর্তমান। তবে অতিপ্রাকৃতিক বিষয়কে গ্রহণ ও বর্জনের উপর ভিত্তি করে এগুলোকে দুভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি ঐশ্বরিক বিশ্বদৃষ্টি এবং অপরটি বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টি।
পূর্বে বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টির অনুসারীদেরকে প্রকৃতিবাদী, এ্যাথিষ্ট (Atheist) কখনো কখনো নাস্তিক বলা হত। বর্তমানে তাদেরকে বস্তুবাদী (Materialist) নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। বস্তুবাদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তবে, অধুনা এগুলোর মধ্যে দ্বান্দিক বস্তুবাদ (Dialectic Materialism) সর্বাধিক পরিচিত, যা মার্কসের দর্শনকে রূপদান করেছে।
ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে যে, বিশ্বদৃষ্টির পরিধি দীনের বিশ্বাসগত অংশ অর্থাৎ আক্বায়েদ অপেক্ষা ব্যাপকতর। কারণ, তা নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী উভয় বিশ্বাসকেও অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। অনুরূপভাবে, ‘মতাদর্শ’ পরিভাষাটিও শুধুমাত্র দ্বীনের সমগ্র বিধি-নিষেধের জন্যেই ব্যবহৃত হয় না।

ঐশী ধর্মসমূহ এবং তাদের মূলনীতিসমূহ:
বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তির স্বরূপ সম্পর্কে ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতানৈক্য বিদ্যমান রয়েছে। তবে, ইসলামী উৎস থেকে যতটুকু জানা সম্ভব, তার ভিত্তিতে বলা যায়, মানুষের আবির্ভাবের সাথে সাথেই ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং মানব জাতির প্রথম সদস্য হযরত আদম (আ.) স্বয়ং আল্লাহর নবী, তাওহীদের প্রবক্তা এবং একেশ্বরবাদী ছিলেন। আর অংশীবাদী ধর্মসমূহ সর্বদা বিচ্যুতি এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রবৃত্তির কামনার ফলে উৎপত্তি লাভ করেছিল। কোন কোন ধর্ম অত্যাচারী শাসকদের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তৈরী হয়েছে যা বাহ্যিক কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং ধর্মে স্রষ্টার সাথে বান্দার ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন ছাড়া কিছু নেই বলে বিশ্বাস করে। একেশ্বরবাদী ধর্মসমূহ, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে ঐশী ধর্মসমূহও বটে, সেগুলো সত্যধর্ম বলে পরিগণিত। এ ধর্মগুলো তিনটি সামগ্রিক মূলে অভিন্ন। যথা:
১. একক প্রভুর প্রতি বিশ্বাস।
২. প্রতিটি মানুষের জন্যে পরকালীন অনন্ত জীবন আছে বলে বিশ্বাস ও পার্থিব কর্মের জন্যে অর্জিত কর্মফল গ্রহণের (দিবসের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।
৩. পরম উৎকর্ষ সাধন এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পথে মানুষকে পরিচালনার জন্যে মহান প্রভুর নিকট থেকে নবীগণ প্রেরিত হয়েছেন বলে বিশ্বাস স্থাপন।
এ মূলত্রয় প্রকৃতপক্ষে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন, যা প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন মানুষের বিবেকেই বিদ্যমান তারই জবাব মাত্র। প্রশ্নত্রয় নিম্নরূপ:
১. অস্তিত্ব দান করেন কে?
২. জীবনের শেষে কী রয়েছে?
৩. কিরূপে জীবনে সাফল্য লাভের সর্বোৎকৃষ্ট কর্মসূচীর পরিচয় পাওয়া যেতে পারে?

প্রসঙ্গতঃ ওহীর মাধ্যমে জীবন-কর্মসূচীর যে বিষয়-বস্তু নিশ্চিতরূপ লাভ করেছে, সত্যিকার অর্থে তাই হল সে ধর্মীয় মতাদর্শ যা ঐশী বিশ্বদৃষ্টির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃত যে কোন ধর্মের কিছু অপরিহার্য, অবিচ্ছেদ্য, আনুষঙ্গিক বিষয় এবং তদসংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে, যেগুলি সামগ্রিকভাবে দীনের বিশ্বাস সমষ্টিকে রূপায়িত করে, সেগুলির সমন্বয়ে মৌলিক মতবিশ্বাস গঠিত। আর উল্লিখিত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের বৈসাদৃশ্যই (ভিন্ন মতই) হল একাধিক ধর্ম, ধর্মীয় দল-উপদল ও মাযহাবের উৎপত্তির মূল কারণ। যেমন: কোন কোন নবীর (আ.) নবুয়্যতের ব্যাপারে মতানৈক্যের কারণেই ইহুদি, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে এবং তাদের মতবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈসাদৃশ্য (মতভিন্নতা) পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি কোন কোন বিষয়, মৌলিক বিশ্বাসের (প্রকৃত) সাথেও অসঙ্গতি সৃষ্টি করেছে। যেমন: খ্রীষ্টানদের ত্রিত্ববাদ, একেশ্বরবাদের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিহীন; যদিও তারা এর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। অনুরূপ রাসুল (সা.)-এর উত্তরসূরী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হবেন, না জনগণ নির্বাচন করবে?’ –এ বিষয়ের উপর মতবিরোধের ফলেই শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের মধ্যে বৈসাদৃশ্য (মত পার্থক্য) সৃষ্টি হয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, তাওহীদ, নবুয়্যত এবং পুনরুত্থান দিবস, এ তিনটি হচ্ছে প্রত্যেক ঐশ্বরিক ধর্মেরই মৌলিকতম বিশ্বাস। তবে এ মূলত্রয়ের বিশেষণের ফলে অর্জিত অথবা তাদের অধীনস্থ অন্যান্য বিশ্বাসসমূহকেও বিশেষ পারিভাষিক অর্থে মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করা যেতে পারে। যেমন খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসকে একটি মৌলিক বিশ্বাস এবং তাঁর একত্বকে অপর একটি মৌলিক বিশ্বাস হিসাবে মনে করা যেতে পারে অথবা নবুয়্যতের বিশ্বাসকে সকল ধর্মেরই মৌলাংশ এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহম্মাদ (সা.)-এর নবুয়্যতের প্রতি বিশ্বাসকে ইসলামের অপর একটি মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করা যেতে পারে। যেমন কোন কোন শিয়া পণ্ডিত ন্যায়পরায়ণতাকে (العدل) একটি স্বতন্ত্র মূল হিসাবে মনে করেন, যদিও এটা তাওহীদেরই একটি শাখা। অনুরূপভাবে, নবুয়্যতের অধীন হওয়া সত্বেও ইমামতকে আলাদা একটি মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘মৌলিক’ শব্দটির ব্যবহার একান্তই পারিভাষিক ও পারস্পরিক সম্মতিভিত্তিক। ফলে, এ ব্যাপারে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।

অতএব, ‘দীনের মৌলাংশ’ শব্দটিকে সাধারণ ও বিশেষ এ দু’টি অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। ‘মৌলাংশ’ পরিভাষাটির সাধারণ অর্থ ‘দীনের শাখাগত’ বিষয় (অর্থাৎ বিধি-নিষেধ) –এর বিপরীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং তা নির্ভরযোগ্য সকল মতবিশ্বাসকে সমন্বয় করে থাকে। আর তার বিশেষ অর্থটি দীনের মৌলিকতম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে, তিনটি মৌলিক বিশ্বাসের মত সকল ঐশী ধর্মের অভিন্ন বিশ্বাসকে (তাওহীদ, নবুয়্যত, পুনরুত্থন দিবস) দীনের মৌলাংশ গঠিত হয় এবং তাদের সাথে অপর এক বা একাধিক মৌলিক বিশ্বাসের সমন্বয়ে ‘দীনের বিশেষ মৌলাংশ’ নির্ধারিত হয়; অথবা এক বা একাধিক বিশ্বাস, যেগুলো মাযহাব বা ফিরকার বিশেষত্ব, সেগুলোর সংযোজনের মাধ্যমে কোন মাযহাবের মৌলিক বিশ্বাসরূপ গঠিত হয়।

দীনের অনুসন্ধান:
(এ অংশে আমরা অনুসন্ধানের উদ্দীপকসমূহ, দ্বীনের অনুসন্ধানের গুরুত্ব, এ সংক্রান্ত একটি ভুল ধারণার অপনোদন করবো।)

অনুসন্ধানের উদ্দীপকসমূহ:
বাস্তবতা সম্পর্কে পরিচয় লাভ এবং সত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সহজাত প্রবৃত্তি ও ফিতরাতগত চাহিদা মানুষের আত্মিক বিশেষত্বসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা প্রত্যেক মানুষের শৈশবে প্রকাশ লাভ করে এবং জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় থাকে। সত্যানুসন্ধিৎসু এ ফিতরাতকে কখনো কখনো ‘অনুসন্ধিৎসু ইন্দ্রিয়ও’ বলা হয়ে থাকে। এ ফিতরাত মানুষকে দ্বীনের কাঠামোর অভ্যন্তরে বিদ্যমান বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে এবং সত্য ধর্মকে চিনার জন্যে উদ্যোগী করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখযোগ্য: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বহির্ভূত এবং অবস্তুগত (অদৃশ্য) কোন বিষয়ের অস্তিত্ব রয়েছে কি? যদি থেকে থাকে, তবে অদৃশ্য জগৎ ও বস্তুজগৎ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের মধ্যে কি কোন সম্পর্ক বিদ্যমান? যদি সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা বহির্ভূত এমন কোন অস্তিত্ব কি বিদ্যমান, যা বস্তুজগতের সৃষ্টিকর্তা?

মানুষের অস্তিত্ব কি শুধুমাত্র এ বস্তুগত দেহের সাথেই সংশ্লিষ্ট এবং তার জীবন কি শুধুমাত্র এ পার্থিব জীবনেরও মধ্যেই সীমাবদ্ধ, না কি অপর কোন জীবনের অস্তিত্বও রয়েছে? যদি অপর কোন জীবনের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে ইহ ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যে কি কোন সস্পর্ক আছে? যদি সম্পর্ক থেকে থাকে তবে পার্থিব কোন্ কোন্ বিষয়গুলো পারলৌকিক বিষয়ের উপর প্রভাব ফেলে থাকে? কিভাবে মানুষের ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণের নিশ্চয়তা দানকারী সঠিক কর্মসূচীর পরিচয় পাওয়া যেতে পারে সর্বশেষে, ঐ কর্মসূচীটা কী?
অতএব, সত্যানুসন্ধিৎসু সহজাত প্রবৃত্তিই হল প্রধান কারণ যা মানুষকে সকল বিষয়ের উপর বিশেষ করে ধর্ম সম্বন্ধীয় বিষয়ের উপর পর্যালোচনার এবং সত্য দীনকে চিনার জন্যে উদ্যোগী করে।
অপর একটি কারণ, যা সত্যানুসন্ধানের প্রতি মানুষের আগ্রহকে বৃদ্ধি করে তা হল সত্যানুসন্ধিৎসা ভিন্ন অপর এক বা একাধিক ফিতরাতগত কামনা সংশ্লিষ্ট অবশিষ্ট চাহিদাসমূহ পুরণের প্রবণতা, যা বিশেষ পরিচিতিসমূহের অন্তর্ভূক্ত। যেমন: বিভিন্ন বস্তুগত ও পার্থিব বৈভব থেকে লাভবান হওয়ার প্রবণতা যা বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা ও অগ্রগতির মাধ্যমে মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পুরণে সহায়তা করে। অনুরূপ, দীন যদি মানুষের আকাঙ্ক্ষা পুরণের, স্বার্থ ও কল্যাণের এবং বিপদ-আপদ ও ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবে তার জন্যে তাও বাঞ্ছিত হবে।
লাভবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষতির হাত থেকে পলায়ন ও বাঁচার সহজাত প্রবণতা দীন সম্পর্কে অনুসন্ধানের অপর একটি কারণ বলে পরিগণিত হয়। তবে জ্ঞানের পরিধির বিস্তৃতি এবং সকল প্রকার বাস্তবতাকে জানার জন্য পর্যাপ্ত শর্ত কার্যকর না থাকার ফলে সম্ভবতঃ মানুষ এমন কোন বিষয়কে অনুসন্ধানের জন্যে নির্বাচন করে থাকে যার সমাধান সহজতর এবং যার ফল সহজলভ্য ও অনুভবযোগ্য। অপর দিকে দীন সম্পর্কিত বিষয়সমূহের সমাধান জটিলতর ও কার্যকর কোন গুরুত্বপূর্ণ ফল নেই। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদেরকে বিবেচনা করা থেকে বিরত থাকে। ফলে স্পষ্টতঃই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দীন সম্পর্কিত বিষয়সমূহই বিচার-বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এমন কি কোন বিষয়ই বিচার-বিশ্লেষণের জন্যে এ বিষয়গুলোর সমতুল গুরুত্ব রাখে না।
এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য যে, কোন কোন মনোবিজ্ঞানী ও মনোসমীক্ষক বিশ্বাস করেন যে, খোদাভীরুতা হল মানুষের একটি প্রত্যক্ষ ফিতরাতগত চাহিদা এবং এর উৎসকে ধর্মানুভূতি নামকরণ করেছেন। একে অনুসন্ধিৎসা, কল্যাণানুভূতি ও সৌন্দর্যানুভূতির পাশাপাশি চতুর্থ আত্মিক বৈশিষ্ট্যরূপে গণনা করেছেন।
তারা তাদের এ ধারণার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শনের জন্যে ইতিহাস ও প্রত্নতত্বের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং বলেছেন যে, খোদাভীরুতা সবর্দা কোন না কোনভাবে সর্বযুগের মানুষের মধ্যে সর্বদা প্রচলিত ছিল। আর এ সার্বজনীনতা ও চিরন্তনতাই খোদাভীরুতার ফিতরাতগত হওয়ার সপক্ষে প্রমাণ বহন করে।
তবে ফিতরাতগত চাহিদার সার্বজনীন অর্থ এ নয় যে, এটা সর্বদা সর্বজনের মধ্যে জাগ্রত ও সজীব থাকবে এবং মানুষকে সচেতনতার সাথে আপন যাত্রার দিকে উদ্বুদ্ধ করবে। বরং তা পারিপার্শিক পরিবেশ ও ত্রুটিপূর্ণ পরিচর্যার কারণে নিস্প্রভ ও নিস্ক্রিয়ও হয়ে যেতে পারে; কিংবা আপন সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে, যেভাবে অন্যান্য সহজাত প্রবণতার ক্ষেত্রে কমবেশী এধরনের নিস্প্রভতা, বিচ্যুতি ও অবদমিত অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
এ মতবাদ অনুসারে, দীনের অনুসন্ধানের উদ্দীপক হল প্রত্যক্ষভাবে মানুষের ফিতরাত বা প্রকৃতি। এ ফিতরাত বা প্রকৃতির অপরিহার্যতা প্রমাণের জন্য যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠার কোন প্রয়োজন নেই।
এ মতবাদকে দীনের ফিতরাতগত হওয়া সম্পর্কিত আয়াত এবং রেওয়ায়েতের উদ্বৃতির মাধ্যমে প্রমাণ করা যেতে পারে। তবে এ ফিতরাতগত চাহিদা অবচেতন অবস্থায় প্রকাশ পায়’–এ ধারণার উপর ভিওি করে কেউ কেউ তর্ক-বিতর্কের খাতিরে নিজের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারে। তাই আমরা শুধুমাত্র এ যুক্তিতেই তুষ্ট হব না এবং দ্বীনের অনুসন্ধানের গুরুত্ব প্রমাণ করতে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের আশ্রয় গ্রহণ করব।

দ্বীনের অনুসন্ধানের গুরুত্ব:
স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান হয় যে, (মানুষের) একদিকে বাস্তবতাকে চিনার জন্যে ফিত্রাতগত চাহিদা রয়েছে, অপরদিকে স্বার্থসিদ্ধি ও লাভবান হওয়া, ক্ষতির হাত থেকে নিরাপদে থাকার প্রবণতা রয়েছে। এ দুটি উপাদান চিন্তা করার জন্যে এবং গভীর জ্ঞানার্জনের জন্যে শক্তিশালী উদ্দীপক। অতএব, কোন ব্যক্তি অবহিত হল যে, যুগ যুগ ধরে একশ্রেণীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দাবী করেছেন যে, ‘আমরা ইহ ও পরকালীন কল্যাণের দিকে মানুষকে পথ প্রদর্শনের জন্যে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রেরিত হয়েছি’ সত্যের বাণী পৌঁছানোর পথে ও মানুষকে পথ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তারা কোন প্রকার চেষ্টা করা থেকে বিরত হন নি এবং যে কোন প্রকার দুঃখ-কষ্টকে সহ্য করেছেন; এমনকি এ পথে তারা নিজ জীবনও উৎসর্গ করেছেন। তখন ঐ ব্যক্তি পূর্বোলিখিত উদ্দীপকদ্বয়ের দ্বারা দীন সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে জানতে চেষ্টা করে যে, পয়গাম্বরগণের দাবী কতটা সত্য এবং কতটা যুক্তিযুক্ত। বিশেষ করে কোন ব্যক্তি জানতে পারল যে, তাদের (নবীগণের) আহ্বান অনন্ত সুখ ও বৈভবের সুসংবাদ এবং অনন্ত দুঃখ-দুর্দশা ও শাস্তির ভীতি প্রদর্শন সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ তাদের আহবানে সাড়া দেয়ার মধ্যে চিরন্তন সুখ-সম্মৃদ্ধির সম্ভাবনা বিদ্যমান। আর তাদের আহ্বানের বিরোধিতা করার মধ্যে অনন্ত ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে ঐ ব্যক্তি কোন্ অজুহাতে দীন সম্পর্কে উদাসীনতা ও শৈথিল্য প্রদর্শন করবে এবং অনুসন্ধান ও গবেষণার জন্যে উদ্যোগী হবে না?
হ্যাঁ, সম্ভবতঃ কেউ অলসতা ও আরামপ্রিয়তার কারণে গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজে নিজেকে পরিশ্রান্ত করতে চান না অথবা দীন গ্রহণ করার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা বা বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে এবং তার কিছু কিছু স্বেচ্ছাচারী কর্ম থেকে তাকে বিরত রাখবে, এ কারণে দীনের অনুসন্ধান থেকে সে নিজেকে দূরে রাখে। কিন্তু এ ধরনের ব্যক্তিরা অচিরেই এ অলসতা ও স্বেচ্ছাচারিতার শোচনীয় পরিণতি দেখতে পাবে এবং পরিশেষে অনন্ত শাস্তি ও অপরিসীম দুর্দশায় পতিত হবে। এ ধরনের ব্যক্তিদের অবস্থা অসুস্থ ঐ নির্বোধ শিশুর চেয়েও খারাপ যে ঔষধের তিক্ততার ভয়ে চিকিৎসকের নিকট যায় না এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে নিজেকে ঠেলে দেয়। কারণ ভাল-মন্দের পার্থক্য বুঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ উক্ত শিশুর ঘটেনি। তবে চিকিৎসকের পরামর্শের বিরোধিতা করার ফলে শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ থেকে বঞ্চিত হত্তয়া বৈ কিছু নয়। কিন্তু একজন বয়ঃপ্রাপ্ত ও সচেতন মানুষ, যে লাভ-লোকসান সম্পর্কে ভাবতে পারগ, সে তো স্বল্পস্থায়ী সুখের বিনিময়ে অনন্ত শাস্তিই ক্রয় করে থাকে। এ কারণেই, পবিত্র কোরআন এ ধরনের উদাসীন মানুষকে চতুস্পদ প্রাণীর চেয়েও অধম বলে বর্ণনা করেছে। কোরান এ শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে বলেছেন:
اولئك كالانعام بل هم اضل اولئك هم الغافلون
“তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত বরং তা থেকেও অধম; তারাই হচ্ছে গাফেল।” (সুরা আরাফ-১৭৯)
অপর একস্থানে কোরান তাদেরকে নিকৃষ্টতম প্রানীরূপে পরিচয় করিয়ে বলেছেন:
انّ شرَّ الدوابَ عند الله ِ الصّم البكم الذين لا يعقلون
“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই নিকৃষ্টতম জীব যারা বধির, বোবা ও যারা বিবেকহীন।” (সুরা আনফাল-২২)

একটি ভুল ধারণার অপনোদন:
হয়ত কেউ কেউ এমন কোন বাহানা দাঁড় করাতে পারেন যে, কোন সমস্যা সমাধানে মানুষ তখনই প্রচেষ্টা চালায়, যখন তা সমাধানের কোন পথ খুঁজে পাবার আশা থাকে। কিন্তু আমরা দীন ও দীন সম্পর্কিত কোন বিষয়ের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে, কোন ফল পাবার ব্যপারে খুব একটা আশাবাদী নই। ফলে সে সকল কর্মের পেছনেই আমাদের সময় ও শ্রম ব্যয় করায় প্রাধান্য দিব, যেগুলো থেকে ফল পাওয়ার ব্যাপারে আমরা অপেক্ষাকৃত বেশী আশাবাদী।
জবাবে এ ধরনের লোকদেরকে বলতে হয়:
প্রথমত: দীনের মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধানের প্রত্যাশা কোনভাবেই অন্য সকল বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তুর সমাধানের চেয়ে কম নয়। আমরা জানি যে, এমন অনেক বৈজ্ঞানিক বিষয় আছে যে, কয়েক দশক অবিরাম প্রচেষ্টার পর সেগুলোর সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: সম্ভাবনার গুরুত্ব কেবলমাত্র এক নির্বাহীর (সম্ভাবনার পরিমাণ) উপরই নির্ভর করে না, বরং সম্ভাব্যতার পরিমাণও বিবেচনা করতে হয়। উদাহরণতঃ যদি কোন একটি ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা ৫% এবং অপর একটিতে সম্ভাবনা ১০% হয়; কিন্ত যদি প্রথম ব্যবসায় সম্ভাব্য লাভের পরিমাণ ১০০০ টাকা এবং দ্বিতীয় ব্যবসায় সম্ভাব্য লাভের পরিমাণ ১০০ টাকা হয়, তবে প্রথম ব্যবসাটি দ্বিতীয় বসার উপর পাঁচগুণ বেশী গুরুত্ব পাবে, যদিও প্রথম ব্যবসায় সম্ভাবনার পরিমাণ ৫% ছিল যা দ্বিতীয় ব্যবসার সম্ভাবনার (১০%) অর্ধেক।
যেহেতু দীনের অনুসন্ধানে সম্ভাব্য লাভের পরিমাণ অসীম, সুতরাং চূড়ান্ত ফল লাভের সম্ভাবনা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন তার সম্পর্কে অনুসন্ধান প্রচেষ্টার গুরুত্ব অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে বেশী। কারণ, ঐগুলোর ফল সীমাবদ্ধ।
অতএব, একমাত্র তখনই দীন সম্পর্কে অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, যখন মানুষ দীনের অসারতা সম্পর্কে অথবা দীন সম্পর্কিত বিষয়সমূহ সমাধানযোগ্য নয় বলে নিশ্চিত হবে। কিন্তু এ ধরনের নিশ্চয়তা কোথা হতে অর্জিত হবে?

@sat মূল: আয়াতুল্লাহ্ মেসবাহ ইয়াজদী রচিত ‘অমুজেশে আকায়েদ’গ্রন্থ।

মতামত দিন