প্রবন্ধ মাসআলা

পশু কুরবানী

আরবী ‘কুরবান’ “قربان” শব্দটি ফারসী বা ঊর্দূতে ‘কুরবান’ রুপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। পারিভাষিক অর্থে কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। প্রচলিত অর্থে, ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ পন্থায় যে পশু জবাই করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘উয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে।

আর এক্ষেত্রে এমন পশু দ্বারা কুরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে একটি কুরবানি পশুর নিম্নলিখিত শর্তসমূহ থাকা উচিত:

১- কুরবানির জন্য ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট’এর মতো পশু কুরবানি করতে হবে।

২- শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কুরবানির ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে উক্ত পশুর বয়স যেন এক বছর পূর্ণ হয়। গরু ও মহিষ কুরবানির ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে তাদের বয়স যেন দুই বছর পূর্ণ হয় এবং উট কুরবানির ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে উটের বয়স যেন পাঁচ বছর পূর্ণ হয়।

৩- কুরবানি যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। অনুরূপভাবে কুরবানির পশু যেন সুস্থ, সবল, স্বাস্থ্যবান, পশুর কোন অঙ্গে যেন কোন প্রকারের সমস্যা না থাকে। এক কথায় বলতে পারি যে, কুরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রটি মুক্ত হতে হবে।

যে সকল ত্রুটির কারণে পশু কুরবানি দেয়া জায়েজ না:

১- পশুর দুই অথবা এক চোখ অন্ধ থাকা।

২- পঙ্গু পশু যে মোটেও হাটতে পারে না।

৩- পশুর দুই অথবা এক কান কাটা থাকে।

৪- দাঁত পড়ে যাওয়া বা ভেঙ্গে যাওয়া পশুর কুরবানি করা।

৫- দুই অথবা এক শিং ভাঙ্গা পশুর কুরবানি করা।

৬- অর্ধেক অথবা এত তৃতিয়াংশ লেজ কাটা পশু।

৭- অসুস্থ, দূর্বল, রোগা প্রকৃতির বা যে পশুর হাড়ের মজ্জা শেষ হয়ে গেছে।

৮- যে পশুর জন্মের সময় লেজ, কান অথবা অন্যান্য অঙ্গ না থাকে।

৯- পাগল পশু।

১০- পশুর অসুস্থতা যা প্রকাশ্যেভাবে বোঝা যায়।

যে সকল ত্রুটি পশু কুরবানির ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলে না:

১- যে পশু চোখে কম দেখে অথবা চোখ ট্যারা থাকে।

২- যে পশুর একটি পায়ে সমস্যা কিন্তু হাটতে তার কোন সমস্যা হয় না।

৩- যে পশুর শিং জন্মগত ভাবেই নেই।

৪- যদি কোন পশুর কানের অগ্রভাগ যদি সমান্য পরিমাণ ছিদ্র, কাটা বা ক্ষয় হয়ে যায়।

৫- পশুর কয়েকটি দাঁত তুলে ফেলা হয়।

৬- পশুর পাগলামির পরিমাণ যদি শুধুমাত্র পশুচারণ এবং ঘাস খাওয়ার ক্ষেত্রে হয়।

৭- যদি পশুর এক তৃতিয়াংশের চেয়ে লেজ কম কাটা থাকে যা তার লজ্জাংশকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম।

৮- যদি জন্মগতভাবে তার কান ছোট থাকে।

কুরবানি পশু জবাই করার সময়াবলি:

কুরবানি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি এবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কুরবানি আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। আল্লাহর প্রত্যেকটির ইবাদতের একটি নিদৃষ্ট সময় রয়েছে অনুরূপভাবে কুরাবনির জন্য নির্ধারিত সময় হচ্ছে তিন দিন অর্থাৎ ১০, ১১, ১২ জিলহজ। ঈদের নামাজের পর থেকে নিয়ে প্রতিদিন সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার পর থেকে জাওয়াল ওয়াখত পর্যন্ত।

কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে কুরবানি যেন আল্লাহর ইবাদতের নিয়তে করা হয়।

পশু জবাই করার শর্তাবলি:

পশু জবাই করার কয়েকটি শর্তাবলি রয়েছে। শর্তাবলি সমূহ হচ্ছে নিন্মরূপ:

১- পশু জবাইকারি যেন মুসলমান হয়। নাসেবি বা রাসুল (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)’এর শত্রু বা কাফের না হয়।

২- পশুকে ধারালো লোহার ছুরি দিয়ে জবাই করতে হবে।

৩- জবাই করার সময় পশুর অগ্রভাগকে পশ্চিম দিকে রাখতে হবে। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পশুকে অন্য কোন দিকে ঘুরিয়ে রাখা হয় বা জবাই করা হয় তাহলে তা হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু যদি ভুলবশত বা নিরুপায় অবস্থায় হয়ে থাকে তাহলে কোন সমস্যা নেই।

৪- জবাই করার সময় বলতে হবে “بسم اللّه”।

৫- পশুর গলার চারটি রগ কাটা হচ্ছে জরুরি।

৫- জবাই করার পরে পশুকে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার শরির নড়ানোর সুযোগ দেয়া।

পশু কুরবানি করার দোয়া:

ইমাম আলি (আ.) থেকে দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন কুরবানির পশু জবাই করার পূর্বে বলতে হবে:

بسم اللَّه و اللَّه اكبر وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّماواتِ وَ الْأَرْضَ حَنِيفاً مسلما وَ ما أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ،إِنَّ صَلاتِي وَ نُسُكِي وَ مَحْيايَ وَ مَماتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعالَمِينَ، لا شَرِيكَ لَهُ وَ بِذلِكَ أُمِرْتُ وَ أَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.

পশু কুরবানি করার সময় বলতে হবে:

– যদি সে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করে তাহলে সে বলবে:

أللهمّ تقبّل منی

– আর যদি কয়েকেজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করে তাহেলে বলতে হবে:

أللهمّ تقبّل منهم

– আর যদি সে নিজের এবং অপর কয়েকজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করে তাহলে সে বলবে:

أللهمّ تقبّل منا

@sat

মতামত দিন