প্রবন্ধ

ইসলাম ও সন্ন্যাসবাদ

কার্ল মার্ক্স ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে ধর্ম হলো শোষিতদের মর্মযাতনা, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। মার্ক্সের মতে ধর্ম সৃষ্টি করে উল্টানো জগত চেতনা, যে ধর্ম সৃষ্টি করে রাষ্ট্র ও সমাজ।

মার্ক্স কেন ধর্মকে আফিম বললেন? কেন বললেন ধর্ম উল্টানো জগত চেতনা সৃষ্টি করে? কেন বললেন ধর্ম রাষ্ট্র ও সমাজের সৃষ্টি? ধর্ম আল্লাহর বিধান নয় কি?

কারো মতে, মার্ক্স নেশাদ্রব্য হিসেবে আফিমকে বুঝাতে চাননি, বুঝাতে চেয়েছেন ব্যাথা বা চেতনানাশক হিসেবে আফিমকে। তাদের মতে, মার্ক্স নিপীড়িত, শোষিত মানুষের কাছে ধর্ম আফিমস্বরূপ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমাজ থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট, অন্যায়, নির্যাতন লাঘবের চেষ্টা করে। নিজে যখন বদলা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সে মনে করে একদিন না একদিন তার প্রতি এ অন্যায়ের বিচার সৃষ্টিকর্তা করবেনই। ধর্মবিরোধী মার্ক্সবাদীদের দৃষ্টিতে এ কারণেই কার্ল মার্ক্স ধর্মকে আফিম বলেছেন- যা উল্টানো জগত চেতনা সৃষ্টি করে।

প্রথমত সকল ধর্মকে এক পাল্লায় মাপা নেহায়েত একটা তাত্ত্বিক ভ্রান্তি।

ধর্মের দু’টি রূপ রয়েছে – এক. প্রকৃত রূপ, দুই. বিকৃত রূপ।

ধর্মের বিকৃত রূপে রয়েছে সন্ন্যাসবাদী তপস্যা, যা সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবন ও চলনকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ করে তোলে। আসলে ধর্মের সন্ন্যাসবাদী চর্চায় মানুষ হারিয়ে ফেলে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক চৈতন্য, উদ্ভব হয় এক বিকৃত ও কৃত্রিম চৈতন্যের।

সন্ন্যাসবাদ প্রকৃতি বিরোধী এইজন্য যে তা মানুষের সহজাত দেহ ও মনের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের প্রকৃতিগত উদ্যোগ, বাসনা ও স্পৃহাকে বিনষ্ট করে। এর ফলে সে হয়ে পড়ে পরিবারবিমুখ, বিবাহবিরোধী ও আত্মবিমুখ। সন্ন্যাসবাদ সমাজ বিরোধী এইজন্য যে, সন্ন্যাসবাদী মানুষ সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন, সামাজিক সংহতি ও সামাজিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি চর্চার সুযোগগুলোকে বিনষ্ট করে। সন্ন্যাসবাদ অর্থনৈতিক উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়। কেননা এ মতে বিশ্বাসীরা দারিদ্র্য বিমোচন, দারিদ্র্য সৃষ্টির কাঠামোগত কারণ অন্বেষণ ও প্রতিকারের কর্মসূচী, অর্থনৈতিক সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠা এবং অসমতা দূরীকরণের কোন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বলতে গেলে করেই না। প্রায়শই এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ও নিঃস্পৃহ থাকে। সন্ন্যাসবাদ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে। সামাজিক ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক উদ্যোগে এরা শামিল হতে চায় না। অরাজনৈতিক ব্যবস্থায় চলমান শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচার, লুণ্ঠনের কোনরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে সবকিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে এ শ্রেণী অভ্যস্ত। মোট কথা, সন্ন্যাসবাদ বাস্তব জগতের উন্নয়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মসূচীতে নিঃস্পৃহ থাকে। এ কারণে সন্ন্যাসবাদী ধর্মের আচার মানুষের চেতনানাশক হিসেবে কাজ করে।

কিন্তু ইসলাম ধর্ম সন্ন্যাসবাদী ধর্মের পুরো বিপরীতে অবস্থান করে। ইসলাম ধর্ম চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন থেকেই আত্ন উন্নয়নের আহব্বান জানায়। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী মুমিনরা ‘ফোরকান’ এর অধিকারী। সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায় বিচার করার শক্তিতেই একজন মুমিন ‘ফোরকান’ এর অধিকারী হয়। একজন ফোরকান সচেতন সত্তা হিসেবে আল্লাহ্‌ ও আল্লাহর বিধানে বিশ্বাস স্থাপন করে। তার সচেতনতাই তাকে সন্ন্যাসবাদ বিরোধী এবং বস্তুবাদ বিরোধী করে তোলে।

প্রকৃত ইসলাম সন্ন্যাসবাদ এবং বস্তুবাদ উভয়কেই মানব জীবনের উন্নয়ন সামাজিক প্রগতি এবং মানবীয় ও আত্নিক মুক্তির অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ন্যাসবাদ ইসলামবিরোধী এমন এক মতবাদ যা আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত নয়।

আল কুরআনে আল্লাহ্‌ বলেন, আর সন্ন্যাসবাদ- ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল, আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নি।” (সূরা হাদীদঃ ২৭)

@sat

মতামত দিন