প্রবন্ধ

হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল হোসাইনী (রহঃ)’র পবিত্র বাৎসরিক উরস মোবারক উদযাপন।

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও আজ ২২ ও ২৩শে মাঘ ১৪২৭ বাংলা/ ০৫ ও ০৬ই ফেব্রুয়ারী ২০২১, রোজ শুক্রবার ও শনিবার ২দিন ব্যাপী সুন্দর, সুষ্ঠ, নিরাপদ ও পবিত্রতার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, হবিগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক সুরাবই সাহেব বাড়ি, দরবার শরীফের সিংহ পুরুষ আরেফে ইরফানিয়াত মশহুর পীর, ইসলামিক লেখক ও গবেষক হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল হোসাইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পবিত্র বাৎসরিক ওরশ মোবারক। তবে এ বছর করোনা ভাইরাস সংক্রমণ জনিত কারণে দেশে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশ মোতাবেক বড় পরিসরে জনসমাগম করা হবে না।

স্থানঃ ঐতিহাসিক সুরাবই সাহেব বাড়ি, দরবার শরীফ, হবিগন্জ।

২দিন ব্যাপী পবিত্র ওরশ মোবারকে মাজার শরীফ গোসল, গিলাপ ছড়ানো, যিয়ারত, মিলাদ-মাহফিল যিকির -শ্যামা মাহফিল, মোনাজাত এবং তবারক বিতরণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে পবিত্র ওরশ মোবারক।

হে মহান রাব্বুল আলামিন! আমাদেরকে তোমার প্রিয় মাহবুব বান্দা আউলিয়া কেরামের সোহবতে থাকার তৌফিক দান করুন। আমাদেরকে উনাদের রুহানী তাওয়াজ্জুহ ও বরকত নসীব করুন। আমাদের সকল প্রার্থনা আজ হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল হোসাইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির অসিলায় কবুল করে নিন। আমীন।

উল্লেখ্য যে, শ্রীহট্ট ও তরফ বিজয়ী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রহঃ)-এর বংশে যে ক’জন আরেফে ইরফান, আলীম-উলামা, মরমী কবি ও সাহিত্যিক-গবেষকের জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল হোসাইনী (রঃ) অন্যতম স্মরনীয় ব্যক্তিত্ব। আরেফে ইরফানিয়াত মশহুর পীর, ইসলামিক লেখক ও গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল হোসাইনী (রঃ) ১৩৩১ বাং, ৩রা কার্তিক হবিগঞ্জ জেলার প্রসিদ্ধ সুরাবই সাহেব বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বংশকৌলীন্য, উঁচুমানের ব্যক্তিত্ব, সততা-নৈতিকতার বিচারে সর্বোপরি একজন ঈর্ষণীয় আইকন ছিলেন। পিতা হযরত সৈয়দ মোঃ ইসমাইল আল হোসাইনী (রঃ) একজন জমিদার, আলেম ও আরেফে ইরফানিয়াত মশহুর পীর ছিলেন। শিক্ষা-দীক্ষা রিয়াযত-রিয়াছত সব কিছুই সাধিত হয় তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা আধ্যাত্নিক পুরুষ হযরত সৈয়দ মোঃ ইসমাইল আল হোসাইনী (রঃ))-এর একান্ত তত্বাবধানে। তিনি তাঁর স্বীয় পিতা নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি শায়েস্তাগন্জ স্কুল হতে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি জগদীশপুর ও শায়েস্তাগন্জ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। অতঃপর দিল্লী থেকে আরবি-ফার্সী সাহিত্যে তৎকালীন সময় উপযুক্ত ধর্মীয় শিক্ষায় সম্মান সুচক সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করেন।

সাংসারিক জীবনে সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ:) সিলেটের বিখ্যাত মরমী সাধক খান বাহাদুর দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর পরিবারে বিবাহ করেন। খান বাহাদুর দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর ছেলে সাধক ও কবি জমিদার খান বাহাদুর দেওয়ান একলীমুর রাজা চৌধুরীর মেয়ে দেওয়ান বেগম বানু রাজা চৌধুরীকে বিবাহ করেন।

কর্মজীবনে তিনি কিছু দিন চা বাগানে চাকুরী, ও একাধারে ১৫ বছর সরপঞ্চ এবং ১৯৪৫ সালে হবিগঞ্জের অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসাবে দায়িত্ব পালন ছারাও জর্জ কোর্ট স্পেশাল জোরার হিসেবেও কাজ করেছেন।

সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ.) ইসলামী চিন্তাবিদ এবং গবেষক ছিলেন । গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই বাগ্মী পুরুষ একজন ইংরেজী, আরবী, উর্দু ও ফারসী ভাষায় উচ্চ শিক্ষিত আলেম ছিলেন। জীবনের অন্তিমকাল অবদি আরবী, উর্দু, ফারসী ও ইংরেজী ভাষায় ইসলাম ধর্মীয় জটিল তত্ত্বসমূহের গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন। আরবি ও ফার্সিতে লিখিত অনেক মুল্যবান কিতাবাদী নিয়ে তিনি গবেষণা করতেন। সারাটি জীবন অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি কঠোর সাধন করে গেছেন।তাঁর লেখা কয়েকখানা ইসলামি পুস্তক রয়েছে। কোরআন- হাদীস হতে তিনি অমূল্য তথ্য সহ পাকপাঞ্জাতন ও শহীদানে কারবালার উপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেখে গেছেন। মহান মনীষী সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ.) অনেক মহামূল্য চৈন্তিক ও লেখ্য উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যার প্রতিটিই তাঁর মনীষা ও বিরাট ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে এবং তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁকে মানুষের মাঝে স্মরণীয় করে রাখবে। সারা জীবনের গবেষণার ফসল “নবী বংশ (পাক পাঞ্জাতন) ও মহান কোরবানী” গ্রন্থটি তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই চারদিকে সারা পড়ে যায়। তাছাউফ পন্থীরা বিভিন্নভাবে বইখানা সংগ্রহ করছেন। তার রচিত শতাধিক উর্দু ও বাংলাভাষায় রচিত কাছিদা, গজল, আধ্যাত্মিক গান, মহরমের জারী-মর্সিয়া রয়েছে। সেগুলো আশেকের আত্মার খোরাক হিসেবে সমাদৃত। তিনি একজন সঙ্গীত অনুরাগী ছিলেন। নিজেও ভাল গাইতেন। হারমোনিয়াম, বেহেলা, সরোদ, দোতরা, ঢোলক, সেতার, বাঁশী তিনি বাজাতে পারতেন। প্রায় সময়ই তিনি এ সব বাদ্যযন্ত্রে মনোযোগ দিয়ে সঙ্গীতের মাধ্যমে ঐশী প্রেমে বিভোর হয়ে যেতেন।

মহান মনীষী সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক আল্ হোসাইনী(রঃ) ছিলেন এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব যিনি স্বীয় মহামূল্য জীবনকে পাক পান্জাতনের তরে মুসলমানদের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য ওয়াক্বফ্ করে দিয়েছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তাঁর জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ব ও খ্যাতি সকলের চক্ষু-কর্ণকে পূর্ণ করে রেখেছিলো।কালের প্রবাহ তাঁর নূরানী যিন্দেগীর পৃষ্ঠা উল্টে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এ মহান অলির ‘ইলমের খাতা, রচনাবলী, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং আল্লাহ্ তা‘আলার ও দ্বীনের পথে তাঁর খেদমত এখনো একইভাবে উন্মুক্ত রয়েছে।

ইলমী জগতের এ মহান প্রদীপ ৬ ই ফেব্রুয়ারি,১৯৮৮ ইং/২২ শে মাঘ ১৩৯৪ বাংলা তারিখে নির্বাপিত হয়ে হায়াতে জিন্দেগী থেকে পর্দা করে মহান আল্লাহর দিদারে চলেযান। যে হস্তদ্বয় চিরদিন সত্যের প্রতিরক্ষায় ও বাতিলের অপসারণের কাজে মশগুল ছিলো তা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং যে সব অঙ্গুলি লেখনী ধারণ করে বহু মহামূল্য ও বিরলদৃষ্টান্ত গ্রন্থ উপহার দিয়েছে তা নিথর হয়ে পড়ে। হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক-আল্ হোসাইনী (রহ:) তার নিজ বাড়ীর সামনেই হোসাইনী মোকামের পার্শ্বে হযরত সৈয়দ শাহ কারার ফুলশাহ মগফুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দরগাহে সমাহিত আছেন।

-পীরজাদা সৈয়দ হোসাইন ঊল হক
সুরাবই সাহেব বাড়ি দরবার শরীফ
শাহজি বাজার(সতাং), শায়েস্তাগন্জ,হবিগঞ্জ।

 

About the author

Syed Hossain ul Haque

সৈয়দ হোসাইন উল হক তরফ ও শ্রীহট্ট বিজয়ী মহান মনিষী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহঃ)এর অধস্থন পুরুষ ‘নবী বংশ পরিচিতি ও মহান কোরবানি’ গ্রন্থের লেখক, হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুরাবই সাহেব বাড়ীর সিংহপুরুষ সৈয়দ মোঃ ইসহাক আল হুসাইনী (রহঃ)সাহেবের মেঝ ছেলের ঘরের বড় নাতি।মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্য গমন অতঃপর ইউনিভার্সিটি অফ সান্ডারল্যান্ড থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে অনার্স এবং কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড পলিটিক্সের উপর এম এস সি। তারপর ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি’তে এম-ফিল। শিক্ষানবিশ কালে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের বিভিন্ন ছাত্র সংঘটনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন পাশাপাশি লন্ডনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বরত।তাছাড়াও যুক্তরাজ্যে একটি ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটর লেকচারার ও গবেষনা কেন্দ্রে অবিরাম বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন।আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে “যবহে আজিম এবং জিকিরে শাহাদাত”শীর্ষক গ্রন্থখানা তার দীর্ঘ গবেষনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

মতামত দিন