প্রবন্ধ

পবিত্র ঈদ-এ-কাওসার, হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর শুভ আবির্ভাব দিবস।

আজ ২০ জামাদিউস সানি “পবিত্র ঈদ-এ-কাওসার”। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাওসার প্রাপ্তি দিবস অর্থাৎ উম্মুল মাসুমিন সাইয়্যিদাতুন নিসায়িল আলামীন হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা -এর শুভ আবির্ভাব (বিলাদত শরীফ) দিবস। কাওসার অর্থাৎ হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা হিজরি-পূর্ব আট সনের এ দিনে জন্ম নিয়েছিলেন। নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর শুভ আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন,মোবারকবাদ ও তার মহান সত্তার শানে,তাঁর পবিত্র পিতা এবং তাঁর পবিত্র বংশধরদের ওপর পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম।

“আসসালামু আলাইকি ইয়া খাতুনে জান্নাত,ইয়া উম্মিয়াতু ইমামুস শুহাদা। ইয়া ফাতেমাতুয যাহরায়ু ইয়া বিন্তা মুহম্মাদিন ইয়া কুর্রাতে আইনির রাসূলি ইয়া সাইয়্যেদাতানা ওয়া মাওলাতানা ইন্না তাওয়াজ্জাহনা ওয়া ওয়াস তাশফাʼনা ওয়া তাওয়াসসালনা বিকি ইলাল্লাহি, ওয়া ক্বাদ্দামনাকি বায়না য়্যাদায় হাজাতিনা। ইয়া ওয়াযিহাতান ইন্দাল্লাহি ইশফায়ী’লানা ইন্দাল্লাহি।আল্লাহুমা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ।”

হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) রিসালাতের দায়িত্ব পালনের ফলে মক্কার নেতৃস্থানীয় কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ্ সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে দেয়। আর এরমধ্যে রাসূলের পুত্র সন্তানরা মারা গেলে আবু লাহাব সহ তার অনুসারীরা রাসূলকে ‘আবতার’ বা ‘লেজকাটা’ তথা নির্বংশ বলে ঠাট্টা-উপহাস, নিন্দা বা তিরস্কার করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এ কথায় খুব কষ্ট পেয়ে সহ্য করে নিলেও তিনি যার হাবীব তিনি সহ্য করলেন না। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তার হাবীবের ব্যথিত মন কে এমন এক অমূল্য নেয়ামত উপহার দান করলেন যা ইতিপূর্বে কখনও কাউকে দেননি, ওহী পাঠালেন “ইন্না আত্বাইনা কা’আল কাউসার অর্থঃ নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি।” এই কাওসার হচ্ছেন হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা। তার এই প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনে সূরা কাওসার নাযিল হয়। কাওসারের অসীম তৃপ্ত এক স্রোত যা আজও বহমান।তাই হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর পুত্রদের ইমামত কখনও শেষ হবেনা, আজও তার একজন পুত্রের ইমামতকাল চলছে, তিনি আছেন বলেই পৃথিবী ধবংস হয়নি। কেয়ামত-ও তার জন্য প্রতিক্ষিত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ওয়ারিশ বিহীন নন, তার ওয়ারিশ আজও উপস্থিত আছেন, তার শিক্ষা ও আদর্শ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কোনো ভয় নেই কারন তার পুত্রের আত্মপ্রকাশ হয়ে গেলে পুনরায় তিনি তার পিতার আদর্শ ও শিক্ষা কে প্রতিষ্ঠা করবেন।

নারীর তিনটি রুপ। কন্যা, স্ত্রী এবং মা। আর তিনটি রুপই আল্লাহর রহমত। কন্যা তার পিতার জন্য রহমত। স্ত্রী তার স্বামীর ইমানের সাক্ষ্যদাত্রী এবং মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। কি বলবো মা ফাতেমা সাঃ আঃ এর শান! সাধারন কন্যা সাধারন পিতার জন্য রহমত। মা ফাতেমা এমন একজনের জন্য রহমত, যিনি নিজেই রাহমাতুল্লিল আলামিন! আল্লাহু আকবার! সাধারণ স্ত্রী সাধারন স্বামীর ইমানের সাক্ষ্যদানকারী, মা ফাতেমা এমন একজনের ইমানের সাক্ষ্য দানকারী যিনি নিজেই কুল্লে ইমান! সাধারন মায়ের পায়ের নিচে সাধারন সন্তানের জান্নাত, মা ফাতেমার পায়ের নিচে এমন সন্তানের জান্নাত যারা নিজেরাই জান্নাতের সর্দার! এই কথাগুলি কায়েনাতের কোন আলেম বা অন্য কেউ ই অস্বীকার করতে পারবেনা। (ভাব পাগলা আব্দুল্লাহ) হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা যখন নামাজের জন্য দাঁড়াতেন তখন তাঁর জ্যোতি আকাশের ফেরেশতাদের দিকসহ নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ত। আর এ কারণে তাঁকে “যাহরা বা দ্যুতিময়” উপাধি দেয়া হয়। হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা ছিলেন নারী ও পুরুষ তথা গোটা মানব জাতির জন্য অসাধারণ ত্যাগ, বিশ্বস্ততা, অন্যায়ের ব্যাপারে আপোষহীনতা, সততা, দানশীলতা, ধৈর্য, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিসহ অনেক মহৎ গুণের আদর্শ। আর এ জন্যেই তাঁর উপাধি ছিল আস-সিদ্দিক্বা বা সত্য-নিষ্ঠ, আল-মুবারাকাহ বা বরকত-প্রাপ্ত, আত-ত্বাহিরা বা পবিত্র, আল-মারজিয়া বা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, বাতুল বা শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে অতুলনীয় আদর্শ, আয যাকিয়া বা সতী, মুহাদ্দিসাহ বা হাদিসের বর্ণনাকারী, সাইয়্যিদাতুন নিসায়িল আলামিন বা নারীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, খাতুনে জান্নাত বা বেহেশতি নারীদের নেত্রী ইত্যাদি। দুনিয়াতে আমরা তাকে যে সন্মানেই ভূষিত করি না কেন তা উনার ক্ষেত্রে অপ্রতুল হয়ে যায়। সন্মানসূচক যে কোন বিশেষণ উনার জন্য যথেস্ট নয়।

হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা জন্মের মাধ্যমে রাসূল অপরিসীম মানসিক শান্তি অনুভব করেন। তিনি তাঁকে কতটা ভালবাসতেন তা তাঁর কথায় ও আচরনে বারবার প্রকাশিত হয়েছে। শুধুমাত্র তাঁর কন্যা হওয়ার কারণে মহানবী (স.) হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) সম্পর্কে এ সকল হাদীস তার বলেননি। কারণ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হচ্ছে যেঃ-  (وما ینطق عن الهوی إن هو إلا وحیٌ یوحی)  অর্থাৎ “আর তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। (তার কথা) তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়।” -(সূরা নাজমঃ ৩ ও ৪) । হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর খোদা-প্রেম ও তাকওয়া, তাঁর দুনিয়াবিমুখতা, তাঁর দায়িত্বশীলতা সব মিলিয়ে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর যে অবস্থান সে কারণেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে ভালবাসতেন। হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা তার পিতা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কাছে আসলে তিনি তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানাতেন। এ ছিল বেহেশতের নারীদের নেত্রীর প্রতি মহান আল্লাহর রাসূলের সম্মান বা ভালবাসা প্রদর্শন। মহানবী যখন কোনো সফরে যেতেন তখন সর্বশেষে বিদায় নিতেন ফাতিমার (সা. আ) কাছ থেকে। আর সফর থেকে ফেরার পর সবার আগে দেখা করতেন হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর সঙ্গে। পবিত্র কুরআনের সুরা নুরে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সাধারণ মানুষের মত আহ্বান বা সম্বোধন করা নিষিদ্ধ করা হলে হযরত খাতুনে জান্নাত (সাঃআঃ) ও মহানবী কে ইয়া রাসূলুল্লাহ বলতে থাকেন। কিন্তু মহানবী (সাঃ) তাঁকে বলেন, এ আয়াতটি তোমার ও তোমার সন্তান এবং তোমার বংশধরদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়নি। তুমি বরং আমাকে (আগের মতই) বাবাজান বলবে! কারণ, এ আহ্বান আমার হৃদয়কে করে প্রশান্ত ও আল্লাহকে করে সন্তুষ্ট । মাওলা মুহাম্মদের ১০০% এর ১% হলো নবুয়ত। বাকি ৯৯% এর অংশ ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা।

হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহাʼর যিয়ারত পাঠঃ-

বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আস্সালামু আলাইকি ইয়া মুমতাহানাতু ইমতাহানাকিল লাযি খালাক্বাকি ফাউয়াজাদাকি লি মামতাহানাকি সাবিরাতান আনা লাকি মুসাদ্দিকুন সাবিরুন আলা মা আতা বিহি আবুকি ওয়া ওয়াসিউহু সালাওয়া তুল্লাহি আলাইহিমা ওয়া আনা আসআলুকি ইন কুন্তু সাদ্দক্বতুকি ইল্লা আল হাক্বতিনি বি তাসদিকি লাহুমা লি তুসাররা নাফসি ফাশহাদি আন্নি যাহিরুন বি ওয়িলাইয়াতিকি ওয়া বি ওয়িলাইয়াতিকি আলে বাইতিকি সালাওয়াতুল্লাহি আলাইহিম আজমায়িন। আস্সালামু আলাইকি ইয়া মুমতাহানাতু ইমতিহানাকিল লাযি খালক্বাকি ক্বাবলা আইঁ ইয়াখলুক্বাকা ওয়া কুনতি লিমান তাহানাকি বিহি সাবিরাতান ওয়া নাহনু লাকি আওলিয়াউ মুসাদ্দিকুনা ওয়া লি কুল্লি মা আতা বিহি আবুকি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামা ওয়া আতা বিহি ওয়সিউহু আলাইহিস সালামু মুসুল্লিমুনা ওয়া নাহনু নাসআলুকা আল্লাহুম্মা ইয কুন্না মুসাদ্দিক্বিনা লাহুম আন তুলহিকানা বি তাসদিকিক্বিনা বিদ দারাজাতিল আলিয়াতি লি নুবাশশিরা আন ফুসানা বি আন্না ক্বাদ ত্বাহুরনা বি ওয়িলাইয়াতিহিম আলাইহিমুস সালামু।

সৈয়দ হোসাইন উল হক


সিপাহসালার ইনস্টিটিউশন | ফেব্রুয়ারি ২০২১এস এইচ হক

About the author

Syed Hossain ul Haque

সৈয়দ হোসাইন উল হক তরফ ও শ্রীহট্ট বিজয়ী মহান মনিষী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহঃ)এর অধস্থন পুরুষ ‘নবী বংশ পরিচিতি ও মহান কোরবানি’ গ্রন্থের লেখক, হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুরাবই সাহেব বাড়ীর সিংহপুরুষ সৈয়দ মোঃ ইসহাক আল হুসাইনী (রহঃ)সাহেবের মেঝ ছেলের ঘরের বড় নাতি।মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্য গমন অতঃপর ইউনিভার্সিটি অফ সান্ডারল্যান্ড থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে অনার্স এবং কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড পলিটিক্সের উপর এম এস সি। তারপর ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি’তে এম-ফিল। শিক্ষানবিশ কালে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের বিভিন্ন ছাত্র সংঘটনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন পাশাপাশি লন্ডনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বরত।তাছাড়াও যুক্তরাজ্যে একটি ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটর লেকচারার ও গবেষনা কেন্দ্রে অবিরাম বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন।আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে “যবহে আজিম এবং জিকিরে শাহাদাত”শীর্ষক গ্রন্থখানা তার দীর্ঘ গবেষনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

মতামত দিন