প্রবন্ধ

ফাদাক দখল করার ক্ষেত্রে খেলাফত মসনদের উদ্দেশ্য।

ইতিহাস গ্রন্থ সমূহে ফাদাক দখল করার ক্ষেত্রে খলিফা মসনদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দু’টি প্রধান কারণ বর্ণিত হয়েছে।

১. অন্যতম কারণটি এমন যে, খলিফা মহোদয় এ কাজের মাধ্যমে আহলে বাইতের (আঃ) অর্থনৈতিক অবস্থা দূর্বল করতে চেয়েছিলেন এবং হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ)-এর বাড়ি থেকে যে সত্যের দাবী উঠেছিল তা সীমিত করা ও দমন করা। কারণ আব্দুল্লাহ ইবনে হাম্মাদ আনসারীর বর্ণনায় ফাদাকের বাগান থেকে বাৎসরিক আয় ছিল ২৪ হাজার দিনার এবং অন্যান্য বর্ণনায় তার পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার দিনার। সকিফায় মনোনীত খলিফার মসনদের বিরোধী পক্ষের হাতে এই বিশাল আয় থাকাটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। ইবনে আবিল হাদিদ মো’তাজেলি আলী ইবনে তাকির কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ফাদাকের বাগানটি অত্যধিক মূল্যবান ছিল এবং বর্তামানে কুফার খেজুর বাগান সমূহ থেকে যে পরিমাণ ফল পাওয়া যায়, তার সমতুল্য খেজুর উৎপন্ন হতো। প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা হযরত আবু বকর ও ওমর ঐ ফসল থেকে হযরত ফাতেমাকে (সাঃআঃ)বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য এমন ছিল যাতে হযরত আলীর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে খেলাফতের বিরুদ্ধে সমস্যা সৃষ্টি করতে না পারে। এই একই উদ্দেশ্যে আহলে বাইতের সদস্য ও বণি হাশেমকেও খোমসের অধিকার থেকে বঞ্চিক করেছিল। যে খোমসের অধিকার মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আনফালের ৪১ নং আয়াতে তাদেরকে সে অধিকার দিয়েছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন :

وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (٤١)

“আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহ্‌র জন্য, রসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্নীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহ্‌র উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল”। -সুরা আনফাল/৪১।

এ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে আমার একটি প্রবন্ধ রয়েছে, পরবর্তিতে তা পেশ করব ইনশা আল্লাহ। সত্যিকার বলতে কি , যে লোক ফকির অর্থাৎ যার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয় এবং যার সাহস ও মানসিকতা দূর্বল হয়েছে ফলে নিজের যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করতে সক্ষম নয়, সে খলিফা হবার বাসনাতো দূরের কথা … সে তখন আয় রোজগারের চেষ্টায় মশগুল থাকবে।

২. ফাদাক দখলের আরেকটি দলিল ইবনে আবিল হাদিদ মো’তাজিলি লিখিত নাহ্জুল বালাগার ১৬ তম খন্ডে এরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ  বাগদাদে আমার এক উচ্চতর শিক্ষক আলী ইবনে ফারকির কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “হযরত ফাতেমা সা. যে ফাদাক সম্পর্কে দাবী উত্থাপন করেছিল, তখন কি তিনি সত্যবাদিনী ছিলেন?” উস্তাদ: হ্যাঁ। ইবনে আবিল হাদিদ মো’তাজিলিঃ তাহলে আবু বকর কেন ফাদাক তাকে দিল না, অথচ সে জানতো যে, হযরত ফাতেমা সা. সত্যবাদিনী ছিল!? উস্তাদঃ  মুচকি হাসি হেসে বললেন, “যদি সেদিন ফাতেমার সা. ঐ দাবীর প্রেক্ষিতে সত্যায়ন করতঃ তাকে ফাদাক দিয়ে দিতো, তবে আরেকদিন এসে বলতো,খেলাফতের হকদার তো আমার স্বামী! আর এভাবে হযরত আবু বকরকে খেলাফতের মসনদ থেকে দূরে সড়াতো এবং তখন বলতে পারতো না যে, এই দাবী প্রমাণ করার জন্য ফাতেমাকে সা. সাক্ষী উপস্থাপন করতে হবে।” ইবনে আবিল হাদিদ মো’তাজিলি এ ঘটনা বর্ণনা করার পর নিজে নিজে এরূপ বলেছেন : هذا کلام صحیح এ কথা সঠিক। এই দু’টি বর্ণনা থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ফাদাক দখল করা ও হযরত ফাতেমা যাহরার সা. ও হযরত আলীর সাথে বিরোধিতা করাটা নিতান্তই অযৌক্তিক ছিল এবং তার রহস্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল।

-আলহাজ্ব ড. মো. সামিউল হক


সিপাহসালার | ইনস্টিটিউশন | অক্টোবর ২০২০এস এইচ হক

মতামত দিন