প্রবন্ধ

আল্লাহর লানত হোক তাদের উপর যারা মুহাম্মদের সন্তানকে এ ভাবে হত্যা করেছে।

সিবতে ইবনে জওযি তার ‘তাযকিরাহ’-তে বর্ণনা করেছেনঃ যখন ইমাম হুসাইন (আ.) দেখলেন তারা তাঁকে হত্যা করবেই,তিনি কুরআন আনলেন এবং তা খুলে মাথার উপর রাখলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন, “আল কুরআন এবং আমার নানা, আল্লাহর রাসূল (সা.) হলেন আমার ও তোমাদের মধ্যে বিচারক। হে জনতা, কিভাবে তোমরা আমার রক্ত ঝরানোকে বৈধ মনে করছো? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি নই? আমার নানা থেকে কি হাদীস পৌঁছায়নি তোমাদের কাছে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে যে আমরা জান্নাতের যুবকদের সর্দার? যদি সন্দেহ থাকে তাহলে জিজ্ঞেস করো জাবির (বিন আব্দুল্লাহ আনসারি)-কে, যায়েদ বিন আরকামকে এবং আবু সাঈদ খুদরীকে। জাফর তাইয়ার কি আমার চাচা নন? ….”

শিমার উত্তর দিলঃ “খুব শীঘ্রই তুমি জ্বলন্ত আগুনের (জাহান্নামের) দিকে দ্রুত যাবে।” (আউযুবিল্লাহ)।

ইমাম বললেনঃ “আল্লাহু আকবার, আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি দেখেছেন একটি কুকুর তার গলা পূর্ণ করছে তার আহলুল বাইত (আঃ) এর রক্ত দিয়ে এবং আমি বুঝতে পারছি সেটি তুমি ছাড়া কেউ নয়।”

শিমার বললোঃ “আমি শুধু জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করবো, যদি আমি বুঝি তুমি কী বলছো।”

ইমাম হুসাইন (আ.) ফিরে দেখলেন তার শিশুপুত্র পিপাসায় কাঁদছে। তিনি তাকে কোলে নিলেন এবং বললেনঃ “হে জনতা, যদি তোমরা আমার প্রতি দয়া না দেখাও, কমপক্ষে এ বাচ্চার উপর দয়া করো।” আচ্ছা, আপনারা সবাই জানেন আলি আসগরের বয়স সেদিনই মাত্র ছয়মাস পুরা হয়েছে। আপনাদের মধ্যে এমন একজনকেও পাওয়া যাবেনা যে জানেনা ছয়মাসের একজন শিশুর পিপাসা মেটাতে কতোটুকু পানি লাগে। বলতে পারেন কতোটা? এক ফোটা? দুই ফোটা? খুব বেশি হলে পাচ ফোটা!!সেই পানিটুকুও না দিয়ে এক ব্যক্তি একটি তীর ছুঁড়লো যা তার গলা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। ইমাম কেঁদে বললেনঃ “হে আল্লাহ, আপনি বিচারক হোন আমাদের মাঝে ও তাদের মাঝে, যারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং এর বদলে আমাদের হত্যা করেছে।” একটি কণ্ঠ আকাশ থেকে ভেসে এলো, “তাকে ছেড়ে দাও হে হুসাইন, কারণ এক সেবিকা তাকে শুশ্রূষা করার জন্য বেহেশতে অপেক্ষা করছে।” এরপর হাসীন বিন তামীম একটি তীর ছুঁড়ে তার ঠোটের দিকে এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে।ইমাম কাঁদলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে অভিযোগ করি, তারা যেভাবে আমার সাথে, আমার ভাই, আমার সন্তানদের এবং আমার পরিবারের সাথে আচরণ করেছে।”

মাওলা হুসাইন সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পরে গেলেন সাজ্জাদের কাছে সে সম্পর্কে ইমাম জয়নুল আবেদিন বলেন “ বাবা (মাওলা হুসাইন) যখন শেষবার আমার সাথে দেখা করতে আসেন, তখন তিনি পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্তাক্ত ছিলেন, আমি তড়িঘড়ি করে উঠতে চাইলাম, পারলাম না। চিৎকার করে ডাকলাম ফুপি আম্মা ( জয়নাব সাঃ আঃ) আমাকে তুলে ধরুন, আমি বাবাকে তাজিম জানাতে চাই। বাবা বললেন “তুমি এখন অসুস্থ, তোমাকে উঠতে হবেনা। আমি তোমাকে ইমামতের দায়িত্ব অর্পন করতে এসেছি। আর তুমি যখন মদিনায় যাবে সেখানে আমার যারা অনুসারী আছে তাদেরকে বলবে তারা যখন ঠান্ডা পানি পান করবে তখন যেন তারা আমাদের পিপাসার কথা মনে করে, আরও বলবে হে হুসাইনের অনুসারীগন! যদি তোমরা কারবালায় থাকতে! যদি তোমরা দেখতে যে কেমন করে হুসাইন তার সন্তানদের জন্য পানি চেয়েছে !” হায় হায়!

যখন সকিনার কাছ থেকে বিদায় নিলেন তখন জোরে ডাক দিয়ে বললেন “আব্বাস !” মাওলা হুসাইনের দাড়ি অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছিলো আবার ডাকলেন “আলী আকবর!, কাসেম!! আমি তোমাদেরকে ঘোড়ায় সওয়ার করিয়েছিলাম, এখন আমাকে সওয়ার করানোর কেউ নেই!! এমন সময় তার হাত ধরলেন জয়নাব। বললেন “ভাইয়া আমি সওয়ার করাবো আপনাকে।“ সারা গায়ে রক্ত। মাওলা হুসাইন বিবি জয়নাবের সাহায্যে জুলজানায় সওয়ার হলেন। কিন্তু জুলজানা আগে বাড়েনা, মাওলা বললেন “জুলজানা! তুমিও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে?” বোবা জানোয়ার মাথা নিচু করে নিজের পায়ের দিকে দেখায়, মাওলা তাকিয়ে দেখে ছোট্ট ছোট্ট হাতে সকিনা জুলজানার পা জড়িয়ে ধরে আছে। আর বলছে “বাবা যেওনা। মাওলা নামলেন, বললেন “মা আমি তোমার জন্য পানি আনতে যাচ্ছি” সকিনা বললো বাবা এখন আর আমার পিপাসা নেই!” যারাই পানি আনতে যায় কেউ আর ফিরে আসেনা! চাচা আব্বাস গেলো আসেনি, ভাই আলী আকবর গেলো, সবাই গেলো কেউ আসেনি। আমি পানি খাবোনা বাবা তুমি যেওনা” তখন মাওলা বললেন “ মাগো আমি আমার নানার কাছে ওয়াদা করেছিলাম, সেই ওয়াদা পুরন করতে যাচ্ছি।“ তখন সকিনা বললো বাবা আপনি সব সময় বলেন ছেলের যেমন হক আছে মেয়েরও হক আছে, বাবা আপনি দুই ভাইকেই সাথে নিয়ে গেছেন, কিন্তু আমাকে নিয়ে যান না! আমাকেও নিয়ে যান” তখন মাওলা বলেন “ মাগো তোমার ভাগের লড়াই এখনও বাকি আছে”। সত্যিই তাই। কি না সয়েছেন তিনি! ছোট্ট দেহে এত কষ্ট! আহ! ইয়াজিদের লস্কর থাপ্পড় দিয়ে উনার গাল ফাটিয়ে দিয়েছে! কান ছিড়ে উনার কানের বালি (দুল) কেড়ে নিয়েছে। বাজারে বাজারে ঘুড়িয়েছে। কারাগারে দিয়েছে। কারাগারেও তাকে মারধর করেছে। এতটাই অত্যাচার করেছে যে মাসুম শিশু শহীদ হয়ে গেছেন।

এরপর দলিলে যা আছে পাঠক, তা বলতে গেলে একেক জায়গায় লাফাতে লাফাতে যেতে হয়। আমার নিজের কাছেই মনে হয় পরীক্ষার পড়া পড়ছি, আগ্রহ থাকেনা। আর সেরকম করে লিখলে লিখার দরকারই হয়না, কারন অনেক বড় বড় লোকেরা তা লিখে গেছেন। ১৪০০ বছরে আমরা তা বুঝিনি। তারচে ববাররের মতো নিজের গতিতে এগোই। যদি ভালো লাগে পাশে থাকবেন, নইলে এড়িয়ে যাবেন। বকাও দিতে পারেন।

মাওলা হুসাইন (আঃ),তাদেরকে সুযোগ দিলেন, জিজ্ঞেস করলেন তোমরা কেন আমাকে হত্যা করতে চাও, তোমাদের মধ্যে কি একজনও মুসলিম নেই? নিজের জুলজানাহতে সওয়ার হয়ে শত্রুপক্ষকে আক্রমন করলেন, অনেক শত্রুকে জাহান্নামে পাঠালেন, ইতিহাস গ্রন্থে শিমার আর মাওলার বেশ কিছু কথোকপকথন পাওয়া যায় আমি সেগুলি এড়িয়ে মুল বিষয়টা ধরে এগোই। আল্লামা মজলিশি তার বিহারুল আনওয়ার এ বলেন মাওলা হুসাইন (আঃ)একটানা উনিশ শত পঞ্চাশ জনকে হত্যা করেন, যার মধ্যে আহতদের ধরা হয়নি।মাওলা হুসাইন (আঃ) শত্রু নিধন করতে করতে নদীর দিকে এগুতে থাকে, সে সময় চার হাজার লোক নদী পাহারা দিচ্ছে, তাদেরকে পরাস্ত করে মাওলা পানির ধারে গিয়ে পানি নিতে যেতেই কেউ একজন চিতকার করে বললো “হে ফাতেমার সন্তান! তুমি তৃপ্তি করে পান করছো আর তোমার তাবু লুট করা হচ্ছে!!” মাওলা পানি ফেলে সেদিকে ছুটলেন। সেদিন ওরা মাওলা কে পানি নেয়া থেকে রুখতে না পেরে তাবু আক্রমন করেছিলো, এত বড় লস্কর হওয়া সত্ত্বেও। আসলে এজিদকে ছোটখাট কোন মাস্তান, বা রাজা ভাবা উচিত হবেনা মোটেই, কারবালায় আসলে কি হচ্ছিলো জানতে বা বুঝতে হলে এজিদ, বা ততকালীন মুসলিম সাম্রাজ্য সম্পর্কে জানা খুব দরকার। যাই হোক সেটা সময় হলেই জেনে যাবেন।

মাওলা যখন তাবুর দিকে ছুটছেন তখন আবু হাতুফ নামে এক লোক তীর ছুড়লো মাওলার দিকে যা উনার কপালে লাগে। আর সাথে সাথেই তীরের বৃষ্টি। মাওলা আহত সিংহের মতো এগিয়ে যেতে থাকলেন সেই মুহুর্তে একটা বড় তীর তার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেড় হয়। রেওয়ায়েতে আছে ৭০ টা তীর আঘাত করে উনাকে। মাওলা পরে যান ঘোড়া থেকে। শিমার আসে মাওলার কাছে, বল্লমের মাথা দিয়ে খোচা দিয়ে দেখে বলে মারা গেছে। ওমর ইবনে সাদ বলে “হাশমীদের কথা কিছুই বলা যায় না, পরীক্ষা করো ভালো করে দেখো।“এবার এগিয়ে আসে মোহাম্মদ ইবনে আস আস, সে আমার মাওলার চুলে ধরে মুখে থাপ্পড় মারে, মাওলা নড়ে উঠে মুহাম্মদ ইবনে আসআস আরেকটা চড় মারে, মেরে বলে “এখনও জান বাকি আছে।“ ইবনে সাদ ভয় পায়, এবার অনেক লোক নিয়ে আসে, কেউ তীর মারে কেউ বল্লম দিয়ে কেউ পাথর দিয়ে অনেক ক্ষন এলোপাথারী আঘাত করে। সে সময় আমার মাওলা শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আমার অপরাধ কি?”এই সময় ওমর ইবনে সাদ পৈশাচিক হাসি দিয়ে বললো দাড়াও আমি পরীক্ষা করে দেখি মারা গেছে কি না, ঘুরে চিৎকার দিয়ে সাদ বলে “জয়নাবের চাদর কেড়ে নাও।” মাওলা তরপে উঠে বলেনঃ “এ কাজ কোরোনা।”লস্কর ছুটলো মাওলাকে লুট করতে, একজন পাগড়ী কেড়ে নিলো, কেউ জামা, একলোক নাম তার জামাল, সে কিছুই পেলো না যখন দেখলো আংগুলে একটা আংটি, খুলে নিতে গেলো, কিন্তু যখমের কারনে আংগুল ফুলে গেছে, আংটি বেড় হচ্ছিলোনা, সে তখন একটা পাথরের উপর মাওলা হুসাইনের আংগুল রেখে আরেক পাথর দিয়ে ছেচে…… আল্লাহ্‌ আর বলতে পারিনা।এরপর খাওলি বিন আল আসবাহি দ্রুত এগিয়ে এলো এবং ঘোড়া থেকে নেমে এলো তার মাথা বিচ্ছিন্ন করতে, কিন্তু সে কাঁপতে লাগলো। শিমার বললোঃ “আল্লাহ তোমার হাত ভেঙ্গে দিক, কেন তুমি কাঁপছো?” এরপর সে ঘোড়া থেকে নেমে এলো এবং তার মাথা কেটে ফেললো। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।ওদিক থেকে বিবি জয়নব চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, ওয়া গরীবা, ওয়া মজলুমা! ওয়া হুসেনা!!!

আল্লাহর লানত হোক তাদের উপর যারা ফাতেমার সন্তানকে এ ভাবে হত্যা করেছে।আল্লাহর লানত হোক তাদের উপর যারা আলীর সন্তানকে এ ভাবে হত্যা করেছে।আল্লাহর লানত হোক তাদের উপর যারা মুহাম্মদের সন্তানকে এ ভাবে হত্যা করেছে।

 

—ভাব পাগলা আব্দুল্লাহ


সিপাহসালার ইনস্টিটিউশন | আগস্ট ২০২০এস এইচ হক

About the author

Syed Hossain ul Haque

সৈয়দ হোসাইন উল হক তরফ ও শ্রীহট্ট বিজয়ী মহান মনিষী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহঃ)এর অধস্থন পুরুষ ‘নবী বংশ পরিচিতি ও মহান কোরবানি’ গ্রন্থের লেখক, হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুরাবই সাহেব বাড়ীর সিংহপুরুষ সৈয়দ মোঃ ইসহাক আল হুসাইনী (রহঃ)সাহেবের মেঝ ছেলের ঘরের বড় নাতি।মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্য গমন অতঃপর ইউনিভার্সিটি অফ সান্ডারল্যান্ড থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে অনার্স এবং কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড পলিটিক্সের উপর এম এস সি। তারপর ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি’তে এম-ফিল। শিক্ষানবিশ কালে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের বিভিন্ন ছাত্র সংঘটনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন পাশাপাশি লন্ডনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বরত।তাছাড়াও যুক্তরাজ্যে একটি ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটর লেকচারার ও গবেষনা কেন্দ্রে অবিরাম বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন।আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে “যবহে আজিম এবং জিকিরে শাহাদাত”শীর্ষক গ্রন্থখানা তার দীর্ঘ গবেষনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

মতামত দিন