প্রবন্ধ

সমাজ কল্যাণে আল কুরআনের ভূমিকা

মানুষের সমাজব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ প্রভৃতি কতিপয় খোদায়ী আইন-কানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই সমাজব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আসমানি গ্রন্থ আল কুরআন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা উপহার দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে আমাদের সমাজের কল্যাণে আল কুরআন বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।

সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। প্রতিটি কাজের পিছনেই কারণ থাকে। মানুষের জয়-পরাজয়, সুখ-দুঃখ তারই কর্মফল। মানুষের জীবনযাপনে যতটা কল্যাণমুখী পথনির্দেশিকা আল কুরআন দিতে পেরেছে, অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ তা পারেনি। আল কুরআনের অনুপম আদর্শের প্রশংসা করে মিশরের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ রাশিদ রিজা তাঁর ‘তাফসির আল মানার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আল কুরআন এমন এক খোদায়ী বিধান যার মত অনুপম পথনির্দেশিকা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায় না”।

পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআন সামাজিক, ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আইনের মাপকাঠি নির্ধারিত করেছে। এভাবে জ্ঞান অর্জনের জন্য আল কুরআন মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। পৃথিবী ও প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপদেশ দিয়েছে। যেমন পবিত্র এ গ্রন্থে বলা হয়েছে: “বল, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ, যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছিল”। (সূরা আনআম-১১)

প্রখ্যাত মিশরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ আবদুহু বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অর্থাৎ এই নিয়ম-শৃঙ্খলা থেকেই আমরা জ্ঞান আহরণ করতে পারব। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান হলো সতর্ক হয়ে সঠিক পথে চলার মাধ্যম। মুসলিম জাতির মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা খোদায়ী সৃষ্টি-ধারা নিয়ে গবেষণা করবেন এবং ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। আল কুরআনে অন্যান্য বিজ্ঞান সম্পর্কেও উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের নির্দেশ অনুসারে মুসলিম বিজ্ঞানীরা একত্ববাদ এবং ধর্মীয় আইনশাস্ত্রের ওপর ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন, কিন্তু যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি ভিত্তিতে অর্জন করা দরকার সেটা হলো খোদায়ী সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন। আল কুরআনে এ সম্পর্কে অনেক আয়াত এসেছে। (তাফসির আল মানার, ৪র্থ খণ্ড)

‘তাফসীর আল মানার’এর লেখকের মতে, কুরআনে বর্ণিত খোদায়ী বিধানের অধ্যয়নে অনেক কমতি রয়ে গেছে। প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা কুরআনের প্রতিটি আয়াত এবং হাদীসের যথাযথ অনুশীলন করতেন, তবে ধর্মীয় আইন-কানুন এবং ভাষার ব্যাকরণের ওপর মুসলমানরা যেরূপ গুরুত্ব আরোপ করেছেন সেরূপ গুরুত্ব যদি অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রদান করতেন তাহলে আজ মুসলমানদের অবস্থা অনেক ভালো থাকত।

খোদায়ী আইন বিজ্ঞানের ওপর জ্ঞান রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানীরা বলেছেন, আল্লাহর জিকিরের চেয়ে আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে চিন্তা করা অনেক শ্রেয়। ইমাম গাজ্জালী তাঁর ‘এহইয়া উল উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে বলেছেন, জ্ঞান সাধনার জন্য সবচেয়ে উত্তম জ্ঞান হলো আল্লাহকে জানা। (তাফসীর আল মানার, ১ম খণ্ড)

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন ছিলেন এমন একজন সমাজবিজ্ঞানী যিনি তাঁর গ্রন্থ ‘আল মুকাদ্দিমা’য় এই বিষয়টার (প্রাকৃতিক জ্ঞান) ওপর আলোকপাত করেছেন। ইউরোপীয়রাও এ বিষয়টির ওপর প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিতে পারেনি। ইবনে খালদুনের চার’শ বছর পরে ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্কো প্রাকৃতিক আইনসমূহ নিয়ে গবেষণার চেষ্টা করেন। মহাবিশ্বের সাধারণ ধর্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্টেস্কো তাঁর ‘দ্যা এসেন্স অফ লেজিসলেশন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির পালনকর্তা হিসাবে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে এই মহাবিশ্বের একটি যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর সৃষ্টির বিধানই হলো লালন-পালন ও সংরক্ষণের। আধুনিককালে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ কুরআনে বর্ণিত খোদায়ী বিধান সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। মুহাম্মদ রশিদ রিজার ‘আল মানার’ এবং আল্লামা তাবাতাবাঈ এর ‘আল মিযান’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত খোদায়ী বিধান সম্পর্কে যে সকল মনীষী বিশদ আলোচনা করেছেন তাঁদের অন্যতম হলেন শহীদ মুহাম্মাদ বাকির আল সদর। ইসলামী আইন প্রণয়নে মানুষ, ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের ওপর খোদায়ী বিধান সম্পর্কিত একটি তথ্যবহুল গবেষণাপত্র ড. আবদুল করিম জায়দান কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।

আল কুরআনে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ১৩ বার উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সুন্নাতুনা’ (আমাদের সুন্নাত বা নিয়মনীতি) শব্দটি শুধু একবার ব্যবহার করা হয়েছে এবং ‘সুনান’ (সুন্নাতের বহুবচন) ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র দু’বার। সকল ভাষাবিজ্ঞানী ও তাফসিরকারের মতে ‘সুন্নাতুল্লাহ’ শব্দের অর্থ সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা। আল্লামা রাগিব ইসফাহানী তাঁর বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ ‘মুফরাদাতুল কুরআন’এ উল্যেখ করেছেন যে, ‘সুন্নাত অর্থ তরিকা বা পদ্ধতি’। ড. জায়দানের মতে, ‘সুন্নাতুল্লাহ’ অর্থ খোদায়ী আইন ও নবী-রাসূলদের আদর্শ মোতাবেক মানবজাতিকে পরিচালনার জন্য খোদায়ী পথ বা ধারা। টয়েনবীর মতে, সামাজিক আইন বা বিধি হলো মানবজীবনের ওপর প্রভাবশালী সে সমস্ত নিয়ম-কানুন যা মানুষ তৈরি করেনি বা মানুষ ইচ্ছেমতো যা রদবদলও করতে পারে না।

কিন্তু খোদায়ী বিধানের এই ধরনের ব্যাখ্যা আল কুরআন দেয় না। আল কুরআন টেক্সট বুকজাতীয় কোনো গ্রন্থ নয়। এটি একটি খোদায়ী গ্রন্থ, মানবজাতির জন্য গাইড বা পথনির্দেশিকা। মানবজাতির কল্যাণার্থে এই পৃথিবী ও তার পরিবেশকে জানতে, সমাজকে অধ্যয়ন করতে এবং সঠিক পথে চলতে আল কুরআন মানুষের প্রতি আহ্বান জানায়।

শহীদ আল সদর বলেন: ‘ঐতিহাসিক আইন সম্পর্কে কুরআনের ব্যাখ্যা বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্নভাবে এসেছে’। তিনি তিন শ্রেণির খোদায়ী আইনের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন, মৃত্যু সম্পর্কে কুরআনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। যেমন সুরা ইউনুসের ৪৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভালোমন্দের ওপর আমার কোনো অধিকার নেই। প্রত্যেক জাতির এক নির্দিষ্ট সময় আছে, যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহূর্তকালকে বিলম্ব বা ত্বরান্বিত করতে পারবে না”।
আবার সুরা আরাফের ৩৪ নম্বরে বলা হয়েছে: “প্রত্যেক জাতির এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা তাদের মুহূর্তকালও বিলম্ব বা ত্বরা করতে পারবে না”।
মানব সম্প্রদায়ের স্থায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে: তারা কি লক্ষ্য করে না আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব সম্পর্কে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করছেন তার সম্পর্কে এবং এ সম্পর্কেও যে, সম্ভবত তাদর নির্ধারিত কাল নিকটবর্তী”। (সূরা আরাফ-১৮৫)
শাস্তির বিধান সম্পর্কেও আয়াত এসেছে। যেমন, “কোনো ব্যক্তিকে প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর সে যদি তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার কতৃকর্মসমূহ ভুলে যায় তবে তার অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে হতে পারে?” “এবং তোমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল, দয়াবান। কিন্তু ওদের জন্য রয়েছে এক প্রতিশ্রুত মুহূর্ত, যা থেকে ওরা কখনো কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না”। ঐসকল জনপদ, তাদের অধিবাসীকে আমি ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা সীমা লঙ্ঘন করেছিল এবং এদের ধ্বংসের জন্য আমি নির্ধারিত করেছিলাম এক নির্দিষ্ট ক্ষণ”। (সূরা কাহফ: ১৫৭-১৫৯)
আল্লাহর নবী-রাসূলদের যারা বিরুদ্ধাচরণ করেছে তাদের সম্পর্কেও আল-কুরআনে বিধান রয়েছে। বলা হচ্ছে, “ওরা তোমাকে দেশ থেকে উৎখাত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করেছিল তোমাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করার জন্য, তাহলে তোমার পর ওরাও সেথায় অল্পকাল টিকে থাকত। আমার রাসূলগণের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদের পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম এবং তুমি আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন পাবে না”। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৭৬-৭৭)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের প্রতি ইঙ্গিত করে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন, “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনও তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসে নি?…’. (সূরা বাকারা-২১৪)
আবার বলা হয়েছে, “যখনই আমি কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন এর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি”। (সূরা সাবা-৩৪)
মানুষের কল্যাণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কেও আল কুরআনে বহু বিধান এসেছে। যেমন সুরা আরাফের ৯৬ নপম্বর আয়াতে এসেছে, “যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তবে তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উম্মুক্ত করতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল, সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের শাস্তি দিয়েছি”। “ওরা যদি সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তাহলে তাদরেকে প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম”।(সূরা জ্বিন-১৬)

আল কুরআনে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা মুসলিম-অমুসলিম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। গোটা মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থরক্ষা এবং কল্যাণার্থে এই সকল কুরআনি বিধান প্রযোজ্য। অপরদিকে শুধু বিশ্বাসীদের জন্য যেমন আলাদা কিছু বিধান রয়েছে, তেমনি শুধু অবিশ্বাসীদের জন্যও কিছু আলাদা বিধান রয়েছে। বিশেষ বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই সকল বিধান নাযিল হয়েছিল।

আল্লাহর সৃষ্টিজগতের অফুরন্ত ভান্ডার গোটা মানবজাতির জন্যই উন্মুক্ত। আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত উপভোগ করে যাতে মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে সেজন্য মুসলমান-অমুসলমান, ধনী বা গরীব সবার জন্যই তা অবারিত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “তোমার প্রতিপালক তাঁর দান দ্বারা এদেরকে আর ওদেরকে সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতিপালকের দান অবারিত”।’ (সূরা বনী ইসরাঈল-২০)

যা হোক, আল কুরআনের সাধারণ বিধানাবলি মানব ইতিহাসের সকল পর্যায়েই প্রযোজ্য। বিশেষ কিছু বিধান বিশেষ কোনো পর্যায়ের জন্য প্রযোজ্য। আল কুরআন মানব ইতিহাসকে চার পর্যায়ে বিভক্ত করেছে। যেমন: স্বর্গীয় পর্যায়, একক সম্প্রদায়, মানবজাতির বিভক্তি, আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব।

আল কুরআনে খোদায়ী বিধানের বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ আছে। শহীদ আল সদর এই সূত্রগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন:
১. শর্তমূলক বিধান: এই ধরনের বিধানের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো শর্ত এবং অপরটি এর উত্তর। যখন শর্ত পূরণ হবে তখন এর জবাব পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমন- পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, “ওরা যদি সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তাহলে ওদেরকে আমি প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম”। (সুরা জ্বিন-১৬)
২. ঐতিহাসিক বিধান: এই ধরনের বিধান অনির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রমের ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত দেয়, যেমন আল কুরআনে বলা হয়েছে: “তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজকে দীনে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না”। (সূরা রূম-৩০)
৩. সিদ্ধান্তমূলক বিধান: এই ধরনের বিধানগুলো কোনো কিছুর বাস্তব সাফল্যের সাথে সম্পর্কিত। যেমন, মুসলমানদের বিচারের সম্মুখীন হওয়া। আল কুরআনে বলা হয়েছে, “মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে?”। (সূরা আনকাবুত-২)

বিধানসমূহের এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের প্রয়োজনে রয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে আমরা অনেক ঐতিহাসিক দার্শনিকের প্রবর্তিত ভুল ধারণা থেকে অব্যাহতি পেতে পারি। কারণ, অনেকে মনে করতেন সকল সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিধান সিদ্ধান্তমূলক। এগুলোকে অন্ধের মতো অনুসরণ করা ছাড়া মানুষের গত্যন্তর নেই। অর্থাৎ মানুষের কাজের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতপক্ষে আল কুরআন মানুষ এবং খোদায়ী বিধানের মধ্যকার সম্পর্কের যে সমস্যা তার সুন্দর সমাধান দিয়েছে।
সিদ্ধান্তকর বিধানের বেলায় যেমন মানুষ এই আইন মানতে বাধ্য তেমনি শর্তমূলক সামাজিক আইনের বেলায় নিজের স্বাধীন মত দেয়ার ব্যাপারে স্বাধীন। যেমন পাক কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “…এবং আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তাহলে তা রদ করার কেউ নেই এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক নেই”। (সূরা রা’দ-১১)
কাজেই এখানে দেখা যাচ্ছে যে, এই শর্তমূলক সামাজিক বিধানসমূহ মানুষের কারণে ক্রিয়াশীল নয় কিংবা মানুষের কোনো ইচ্ছাকেও এই বিধান অবদমিত করে না। বরং এই ধরনের বিধানের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও সৃষ্টিশীলতা প্রমাণিত হয়। এই বিধান মোতাবেক দেখা যায় মানবজাতির উন্নয়ন ঐতিহাসিক বিবর্তন ধারায় মানুষের প্রভাব অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এই ধরনের বিধান মানুষের নির্বাচনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রদান করে।

সমাজের সাধারণ প্রবণতামূলক যে বিধান তা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এক্ষেত্রে মানুষের একটি প্রান্তীয় সুযোগ রয়েছে যদিও তা কল্যাণকর নয়। অর্থাৎ মানুষ এই বিধানকে সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জ করে বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে। কিন্তু পরিণতিতে সুফল হয় না। সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় হযরত লূত আঃএর জাতির কথা। তাঁর জাতি একটি সাধারণ সামাজিক নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে নারী-পুরুষের বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। পরিণতিতে নিজেদের ধ্বংসই ডেকে এনেছিল। ঠিক তেমনি সমাজতন্ত্র(কমিউনিজম) ধর্ম ও খোদায়ী বিধানকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। আজ তারাও ধ্বংস হয়ে গেছে।
সুতরাং দেখা যায়, খোদায়ী বিধানের বিরুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে মানুষের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে তা সীমিত সময়ের জন্য। ইতিহাস এর সাক্ষী।
‘আল সুনান আল ইলাহিয়া’ গ্রন্থের রচয়িতা আবদুল করিম জায়দান বলেন, ‘আল কুরানের আয়াতসমূহে খোদায়ী বিধানের অব্যাহত ধারা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। এখানে প্রাচীন জাতিসমূহের কার্যকলাপ এবং শাস্তির উদাহরণ এসেছে যেন সেসকল দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষ সেই ধরনের কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকতে পারে’।

আল কুরআনের খোদায়ী বিধান যেমন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তেমনি এগুলো মানবতার সাথেও সম্পর্কিত। কারণ, মানুষের কল্যাণের জন্যই এসকল বিধান। কাজেই আল কুরআন মানুষকে ইতিহাসের গতিধারায় এবং মানবসমাজ গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দায়িত্বশীল করেছে। তাই প্রধান বিধানকর্তা হিসাবে আল্লাহকে জেনে নিয়ে আল্লাহরই শক্তির অধীনে সঠিক পথে চলার শিক্ষাই কুরআন মানুষকে দেয়। আল কুরআন মুসলমানদের প্রতি আহ্বান রেখেছে খোদায়ী বিধানগুলো অধ্যয়ন করতে, সেগুলোর নির্দেশ অনুযায়ী চলতে। এ প্রসঙ্গে শহীদ মুহাম্মাদ বাকির সদরের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা এই নিবন্ধের ইতি টানব। বাকির সদর বলেন: ‘তুমি যদি জীবনে গঠনমূলক কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাও তাহলে এই আইনগুলো আবিষ্কার কর। এগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে চেষ্টা কর এবং সেই অনুযায়ী আমল কর। নতুবা এগুলো তোমার কোনো কাজে আসবে না। কুরআনের এই খোদায়ী বিধানগুলোকে উপলব্ধি করার জন্য হৃদয়ের দৃষ্টি উন্মুক্ত কর এবং বুঝতে চেষ্টা কর কী সেখানে রয়েছে’।

erfan@sat

About the author

Sipahsalar

মতামত দিন