ইতিহাস প্রবন্ধ

মরমী সাহিত্য ও সুফি সাধনা : হবিগঞ্জ প্রসঙ্গ

প্রসঙ্গ কথাঃ আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। লাশরীক। তিনি স্বয়ং সম্পূর্ণ। তাঁর কোন তুলনা নেই। তিনিই আদি, তিনিই অন্ত। তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন, তার কোন ক্ষয় নেই, লয়ও নেই, তিনি সর্বময়। তাঁর অস্তিত্ব সর্বত্র। প্রকাশ্যেও গোপনে সবখানেই তিনি প্রকাশ ও গুপ্তে বিরাজমান। মহান আল্লাহর কোন আকার আকৃতি নেই। সৃষ্টি জগতের কোন বস্তর সাথে তার অস্তিত্বের কোন সাদৃশ্য নেই, অথচ তিনি কুল্লে শাই’ইন মোহিত, সবখানেই আছেন। কবি নজরুলের ভাষায়—“সকলের মাঝে প্রকাশ তাহার, সকলের মাঝে তিনি, আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি। তার অস্তিত্বকে পরিমাপ ও পরিমাণ করা যায় না। তার অস্তিত্বের কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই, কোন কিছুই তাঁর অস্তিত্বকে স্পর্শ করতে পারে না অথচ তিনিই সব কিছুর স্রষ্টা। সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবকিছুর ধারণা হতে তিনি উর্ধে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অথচ তিনি তার ক্ষমতার উপস্থিতিতে মানুষের শা-রগের চাইতেও নিকটে। তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে আউলিয়াগণ তাঁর দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন ও দেখেন। মানুষের গোপন অন্তরে যা কিছু গোপন থাকে তাও আল্লাহপাক জানেন। তাঁর ইচ্ছা ও অনুগ্রহ ব্যতিত সামান্য চক্ষুর পলক পড়াও সম্ভব নয়। সমগ্র সৃষ্টি জ্ঞান যদি একত্রিত হয়ে তাঁর একটি আদেশের বিরোধিতা করে তবুও তারা অসমর্থ হবে। কর্ণহীন অবস্থায়ই তিনি শ্রবণ করেন। চক্ষুহীন অবস্থায়ই তিনি দেখেন। হস্তহীন অবস্থায়ই তিনি ধারণ করেন। যন্ত্রহীন অবস্থায়ই তিনি সৃষ্টি করেন। মোট কথা তার পরম পরাক্রমশালী শক্তি ও গুণাবলী সৃষ্টজীবের শক্তি ও বৈশিষ্টের অনুরূপ নয়। নেই কোন সাদৃশ্যও। তবুও শুধুমাত্র আল্লাহর তৌহিদের উপর বিশ্বাস অর্থাৎ, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ (মুনিব) নেই এটুকু বললেই ঈমান পূর্ণ হবেনা। সাথে সাথে ‘ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ হযরত মোহাম্মদ মস্তফা(সঃ) কে আল্লাহর রসূল হিসেবে বিশ্বাস ও মান্য করার পরই ঈমানের পূর্ণতা আসবে। দুনিয়া ও আখেরাত সম্পকে নবী করিম (সঃ) যে সব পয়গাম দিয়েছেন এর উপর পূর্ণ ঈমান আনা এবং সবকিছু মানার পরই বান্দাহ, ঈমানের পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে। একারণেই সূফী সাধকরা ঈমানের বিষয়কে বিভিন্নভাবে গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। সূফি কবি সৈয়দ শাহ নূর (রঃ) এর ভাষায়ঃ

নূরে কান্দে, কান্দে নূরে ঈমানের লাগিয়া, হেলায় হারি ঈমান পাইনি খুজিয়া

হায় হায় রতন ধন হারলু বিফলে, কি জুয়াব দিমু আমি হাশরের কালে।

হুব লোভে খিদা নিদ্রা সংগে আইল কৈরী, লুত ডাকাইত অবশেষে ঈমান কৈল চুরি।

ষোল্ল আনা লইয়া আইলু এক আনা নাই, ঈমান ছাড়াইয়া দেয় তিরি পুত্র ভাই।

ভবের ধনের কিস্মত আছে ঈমানের নাই, ঈমান দুর্গত ধন বিফলে গোয়াই।

সৈয়দ শাহ নুরে ইন ঈমান বড় ধন, হেলায় হারিল ঈমান অমূল্য রতন।

এ কারণেই প্রত্যেক মুমিন বান্দাহকে ঈমান বিষয়ে হুশিয়ার থাকতে হয়। আত্নদর্শন অর্থাৎ নিজেকে নিজে জানা হচ্ছে সূফী দর্শনের মূল কথা। কোন এক সূফীর ভাষায়ঃ- “আগে চিন নিজকে নিজে, পাছে চিন নিরঞ্জনে, ও মানুষ ধরবে যদি তারে একজন সুফী সাধক বলেছেনঃ- “দীনহীন, চিরে তরে, তোরে চিনলে চিনবে তারে, মনের মত ভাবলে পরে, পাবে তারে তর অন্তরে” সূফীবাদ কি এবং এর ক্রমবিকাশের ধারা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার আলোকে বলা যেতে পারে।

ইসলামে মরমীবাদকে সূফীবাদ হয়। প্রকৃতপক্ষে, এটা কোন মত নয় বরং ধর্মীয় চিন্তার একটি পদ্ধতি বিশেষ। যুক্তিবাদের প্রতিদ্বন্দী হিসেবেই মরমীবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। আল্লাহর নিকট মানুষের সার্বিক আত্মসমর্পণের প্রবণতা হতেই এর উৎপত্তি। নৈতিক শৃঙ্খলা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য কামনার্থে ইসলামে যে মরমী ভাবধারার উৎপত্তি হয় তাকেই সূফীবাদ বলা হয়। সূফী শব্দটি একদল সংসার বিরাগীর সম্পর্কে প্রথম আরবী সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছিল নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে। ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে এই শব্দ প্রথম প্রযুক্ত হয়েছিল বিখ্যাত সূফী জাবির বিন হাইয়ান (রঃ) সম্বন্ধে। তারই সমসাময়িক ছিলেন বলখের ইব্রাহিম বিন আদহাম (রঃ)। সূফীত্ব আল্লাহকে জানবার ও বুঝবার একটি প্রয়াস। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে ইহাকে মারিফাত’ বলা হয়। এই মরমীবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন হযরত আবু সুলাইমান আদ-দারানী (রঃ)। ইহার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মারুফ আল কারখী রহঃ।

মরমীবাদের মূল কথা এই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কিছুরই বাস্তব সত্বা নাই। আল্লাহ অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক এবং তাকে পাওয়ার প্রধান পথ হচ্ছে প্রেম। সুতরাং প্রেমই মরমীবাদের মূলভিত্তি। সূফীবাদ আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর ধ্যানের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ অনুভূতি বা মনোভাব। ইসলামে একদিকে মুতাজিলাদের উগ্র বুদ্ধিবাদ, অপর দিকে রক্ষণশীল ঐতিহ্যবাদীদের অন্ধ আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ উৎপত্তি হয়েছে। এতে জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে “নকল” এবং “আকল’ এর ভূমিকা অগ্রাহ্য করে ‘কাশফ’ এর উপর অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সূফী শব্দের উৎস বিবিধ, তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে ‘সূফী” শব্দটি আরবী ‘সুফ’ (পশম) শব্দ হতে উদ্ভূত। পশমী বস্ত্র পরিধান করা সরল জীবন যাপনের প্রতীক রূপে পরিগণিত হত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবাগণ বিলাস- বেসনের পরিবর্তে সাদাসিধা ও অনাড়ম্বর পোশাক পরিধান করতেন। মদীনার মসজিদে যে সকল সাহাবা রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে থেকে নিরাসক্ত জীবন যাপন করতেন তাদেরকে “আহলুস সুফফা’ বলা হত। এজন্য কোন কোন চিন্তাবিদ আহলুস সুফফা’ শব্দ হতে সূফী শব্দের সৃষ্টি বলে মনে করেন। আবার কোন কোন পণ্ডিত “ছাফ’ শব্দ হতে ইহার উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন। ‘ছাফ’ মানে মর্যাদা বা সারি। নামাযের সময় সময় সূফীরা মহানবীর সঙ্গে প্রথম সারিতে দাঁড়াতেন। কিন্তু জামী, রুমী প্রমুখ সূফী সাফা অর্থাৎ পবিত্রতা হতে সূফী শব্দের উৎপত্তি নির্ণয় করার পক্ষপাতী। কেননা সূফীরা পবিত্র জীবন যাপন করতেন। তাই সূফীদের মতে ‘সাফা’ অর্থাৎ পবিত্রতা এবং আত্মার শুদ্ধি হতে সূফী কথাটির উৎপত্তি। পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণ গ্রীক শব্দ ‘সোফিয়া’ হতে এর উৎপত্তি হয়েছে বলে প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেও ভাষাগত ও ঐতিহাসিক লিক দিয়ে তাদের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বিভিন্ন সূফী ও সূফীবাদের লেখক সূফীবাদের বিভিন্নরুপ সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেমন মারুফ আল কারখী (রহঃ) বলেন, সূফীবাদ হল ঐশী সত্ত্বার উপলব্ধি। হযরত যুন্নুন মিসরী (রঃ) বলেন, খোদা ছাড়া আর সব কিছু বর্জন করাই সূফীবাদ। হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) বলেন, জীবন-মৃত্যু ও অন্যসব ব্যাপারে আল্লাহর উপরে নির্ভরতাই সূফীবাদ। আল কুশাইরী (রঃ) বলেন, বাহ্য ও অন্তর জীবনের বিশুদ্ধিই সূফীবাদ। আৰু সাহল সারুকী (রঃ) বলেন, আপত্তিকর বিষয় হতে দূরে সরে থাকাই সূফীবাদ। আবু মোহাম্মদ আজ-জারিনী (রঃ) বলেন, সদভ্যাস গঠন এবং সমস্ত অনিষ্টকর কামনা হতে হৃদয়কে মুক্ত করাই সূফীবাদ। আবু আলী আজিনী (রঃ) বলেন, সূফীবাদ মনোরম আচরণ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। আবু আব্দুল্লাহ আফিফ (রঃ) বলেন, আল্লাহ যাকে তার প্রেম দিয়ে শুদ্ধ করেছেন সেই ব্যক্তি হলেন সূফী। শায়খুল ইসলাম জাকারিয়া আনসারী (রঃ) বলেন, সূফীবাদ মানুষের আস্থার বিশোধনের শিক্ষা দান করে। তাঁর নৈতিক জীবনকে উন্নত করে এবং স্থায়ী নিয়ামতের অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষের ভিতরের ও বাহিরের জীবনকে গড়ে তোলে। এর বিষয়বস্তু হচ্ছে আত্মার পবিত্রতা বিধান এবং তার লক্ষ্য চিরন্তন সুখ শান্তি অর্জন। উপরের সংজ্ঞা হতে বুঝা যাচ্ছে যে, অন্তরের আত্মার বিশুদ্ধির মাধ্যমে বাহ্য ও অন্ত জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করে খোদায়ী সত্ত্বার উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে চিরন্তন শান্তি লাভই সূফীবাসের শিক্ষা।

মরমীবাদের প্রধান প্রবক্তা আৰু সুলায়মান আদ দারানী (র) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। হযরত মারুফ আল-কারখী (রঃ) সূফীবাদের সংজ্ঞা প্রদান করে তিনি ‘সূফীবাদ’ কে খোদায়ী সত্ত্বার উপলব্ধি বলে অভিহিত করেন। প্রথম দিকে কেবলমাত্র ইন্দ্রিয় সংযমের উপর ভিত্তি করে সূফীবাদ গঠিত হলেও হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর পর হতেই ধর্মীয় এবং অন্যান্য দার্শনিকদের চিন্তাধারা গ্রহণ করে তা সমৃদ্ধ হতে থাকে। ভারতীয় সূফীদের মধ্যে হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী (রহঃ) সবার অগ্রগণ্য। সে যুগের অন্যান্য সূফী হলেন, হযরত বখতিয়ার কাকী (রঃ), হযরত ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেস্কর (রঃ) ও হযরত নিয়াম উদ্দীন আউলিয়া (রঃ)। বর্তমানকালে সূফীবাদের চারটি মাযহাব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এইসব মাযহাব সাধারণতঃ তরীকা বা সিলসিলা নামে পরিচিত। যথা-কাদেরীয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া ও মুজাদ্দেদিয়া। “যিকির প্রথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সময়ে চালু থাকলেও সূফীগণই মুসলমানদের মধ্যে তাসবীহ, ও যিকির এর ব্যাপক বিস্তার সাধন করেছিলেন। আজকাল কেউ কেউ এ যিকির ও তসবিহ জপকে একটি অতিরিক্ত বস্তু মনে করে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে ধ্যানের উপায় হিসেবেই যিকিরের প্রচলন। বিখ্যাত মরমীবাসের সাধক বাগদাদের আল-জুনায়েদ (রঃ) একে আনন্দময় ধ্যান-তন্ময়তা লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহার করতেন। কোন এক সমালোচকের তীর এই অভ্যাসের প্রতি কটাক্ষ করলে তিনি বলেছিলেন, যে পথে আমি আল্লাহকে পেয়েছি, তা আমি ত্যাগ করতে পারিনা।

যে সকল সূফীসাধক ও মরমী কবিদের কালজয়ী পক্তিমালা বাংলার সুরময় ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে তাদের মধ্যে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রঃ)’র অধঃস্থন পুরুষ সৈয়দ মুসা (রঃ) লশকরপুর, সৈয়দ সুলতান উরফে সৈয়দ মীনা (রঃ) সুলতানসী, সৈয়দ আব্দুর রহিম হোসেনী (রঃ) সুলতানসী, সৈয়দ আব্দুন নূর হোসেনী চিশতী (রঃ), সুলতানশী (প্রকাশিতঃদীনহীন), সৈয়দ জহুরুল হোসেন (রঃ), মধুপুর, বাহুবল, সৈয়দ শাহ ইজহার আলী (রঃ) চন্দ্ৰছুরি, সৈয়দ গোলাম মোস্তফা হোসেনী চিশতী (রঃ) সুলতানসী, মৌলবী শাহ মোহাম্মদ ইয়াসীন (রঃ) কাইছনাজুরী, চুনারুঘাট, মরমী কবি শেখ ভানু (রঃ) ভাদীকারা, লাখাই, কিমত আলী চিশতী (রঃ), বামকান্দি হবিগঞ্জ, সৈয়দ খাজা রমজান আলী উরফে সাবাল শাহ (রঃ), বাঘারুক, চুনারুঘাট, সৈয়দ শাহনুর (রঃ) জালালসাপ, নবীগঞ্জ, শাহ কলন্দর ফকির, পুড়াসুন্দা, হবিগঞ্জ, মাওলানা সৈয়দ শাহ আব্দুল্লাহ (রঃ) সায়দাবাদ, নবীগ, মরমী কবি এলাহী বখস (রঃ), লামাপাড়া, বানিয়াচং, শাহ হোসেন আলী, ফতেহপুর, মাধবপুর, মাওলানা মোহাম্মদ ইব্রাহীম আলী, কাকিয়ারআব্দা, হবিগঞ্জ, আলী মকদ্দর চৌধুর উরফে তকদীর সরাবাদ, (পিঠুয়া) নবিগঞ্জ প্রমুখ। তাদের কালজয়ী পংক্তিমালার কতিপয় নমুনা হচ্ছেঃ

(১) কহে সুলতান, জীবন স্বপন, মরণ জানিও সার। সে পন্থ ছাড়িয়া, অসারে মজিয়া, ভুলি রৈলু অনিবার।

(২) আলেমূল গায়েব ভূমি রহিম রওশন, মুই তোর অন্ত না পাইলুরে জানম (সৈয়দ ইলিয়া কুদ্স কুতুবুল আউলিয়া)

(৩) দয়াল রসূল ও হবিব বিনে কে আছে আমার। সকল কুল ছাড়িয়া আমি দয়াল রসুল ধইরাছি চরণ তোমার। সৈয়দ আব্দুর রহিম হোসেন চিশতী)

(8) কাফে আল্লাহ নু-য়ে নবী দুয়ে একজন, নূরের পিরিতে আল্লায় সৃজিলা ভূবন(সৈয়দ শাহ অছি উল্লাহ)

(৫) করিম রহিম নামটি তোমার জগতে ঘোষণা, লা-তাকনাতু আশা দিয়া নৈরাশা কইরনা। (সৈয়দ আব্দুন নূর হোসেন চিশতী দীনহীন)

(৬) অজুদে মজুদ আছে লীলার কারখানা, সৈয়দ শাহ নূরে কইন দেখালে তলু ফানা। (সৈয়দ শাহ নূর।

(৭) সেতারে সে তার, বাজে তার,  তারে তারে ধর তারে, পাবে তারে দমের ঘরে, তারের বাজনা শিখলে নারে নামাজ পড় কার—(সৈয়দ গোলাম মোস্তফা হোসেনী)

(৮) আমারই গোনাহ, তোমারই জানা, মাফ কইরা দেও ইয়া রাব্বানা, তোমারই বান্দা, নবীজির উম্মত, পাইবে রহমত, এই বাসনা—(শাহ কিমত আলী চিশতী)

(৯) সদায় জপ নামরে ছাড়িয়া অন্যায় কাম, কয়বরেতে হইব সুখ লইলে আল্লার নাম। (খাজা রমজান আলী)

(১০) মন যে আমার চায় রে বন্ধু, মন যে আমার চায়, তোমার সাথে দিবানিশি প্রেমখেলি খেলায় (সৈয়দ শাহ আব্দুল্লাহ)

(১১) নয় দরজা করি বন্ধ, লইওরে ফুলের গন্ধ, অন্তরে জপিও বন্ধের নামরে ভমরা, নিশিতে যাইও ফুলবনে। (শেখ ভানু)

(১২) আমি পাইলামনারে তাও, মনাই সাধুর নাও, পবনেতে ভর করিয়া নৌকা বাইয়া যাও, জহুরুল হোসেনে কয় মুর্শিদ বড় ধন, সেই বাজারে গেলে মিলে অমূল্য রতন- (সৈয়দ জহুরুল হোসেন)

(১৩) দরবারেতে খাড়া আমি গোনাহগার, রহম কর খোদা তুমি খাতিরে পিয়ার রাসুলুল্লাহর। ( তকদীর)।

ঐতিহাসিক যোগসূত্রঃ চর্তুদশ শতাব্দীর রোদ ঝলমল একটি সকাল। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ী উপত্যকা। বয়ে চলেছে প্রাচীন এক নদী। নাম তার সুরমা- ইবনে বতুতার ‘শহরে আজরক। পেছনের পটভূমিতে বিশাল খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়। নদীর তীরে এসে দাঁড়ালেন এক দরবেশ। সুদূর ইয়েমেন থেকে কান্দাহার আর হিন্দুকুশ পাহাড়ের গিরিপথ বেয়ে এই দরবেশ এসেছেন পাহাড়ী স্রোতস্বিনী নদীটির তীরে। আরোও ৩৬০ জন মুজাহিদ দরবেশ তার সফর সঙ্গী। তাদের মুখেতে কলেমা হাতে তলোয়ার, বুকে ইসলামী জোশ দুর্বার।

সুরমা নদীতে পারাপারের জন্যে সেদিন একটি ডিঙ্গি নৌকাও নেই। অত্যাচারী রাজার আদেশে মাঝিরা পালিয়ে গেছে। দরবেশ তার শান্ত সৌম্য চেহারা নিয়ে এগিয়ে গেলেন নদীর দিকে, ছড়িয়ে দিলেন নিজের জায়নামাজ সুরমার পানির উপর। জায়নামাজ নদীর এপার থেকে ওপারে ভিড়লো। ইয়েমেনী পীর নদী তীরের শিলায় পা রাখলেন। বললেন, “সিলহট’, জন্ম নিলো নতুন এক নাম। আসাম উপত্যকার গ্রামে গ্রামে, দূরের বিচ্ছিন্ন পাহাড়ী জনপদে এবং হাওড়ের প্রত্যন্ত ভাটিতে ধ্বনিত হলো আল্লাহু আকবর’।

খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের নীচে চতুর্দশ শতাব্দীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো ছোট ছোট রাজাদের কয়েকটি রাজ্য। রাজারা ছিলেন মহাপরাক্রমশালী। রাজাদের আদেশে যখন তখন গর্দান যেতো প্রজাদের। রাজারা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এসব রাজ্যে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান প্রজাও ছিল, আর এই নিরীহ লোকজন ছিল স্বাধীনতাহীন। নিজেদের ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে তাদের মেনে নিতে হতো অনেক বিধিনিষেধ। এমনই এক স্বাধীনতাহীন জনপদে পা রাখলেন প্রাচ্যের সেই মহান দরবেশ। নিপীড়িত মানবতার মুক্তি এবং ইসলামের সাম্যের বাণী তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তার আহবান ছড়িয়ে পড়লো দিকে দিকে। দীর্ঘদিন অত্যাচারে সমস্ত মানুষ দলে দলে এসে দীক্ষিত হলো নতুন ধর্মে। যে ধর্মে রাজায়-প্রজায় নেই ফারাক। নেই ধনী-গরীবে কোনই ভেদাভেদ।

মহান দরবেশ এই উপমহাদেশের ইতিহাসে সৃষ্টি করলেন নতুন ইতিহাসের অধ্যায়। সেই মানববাদী আদর্শের ধারাবাহিকতা এখনও উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করে চলেছি আমরা। এই উত্তরাধিকার গৌরবের। যা মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রেরণা দেয়। ইতিহাস বদলে দেয়া সেই দরবেশ এখন শুয়ে আছেন এই জমিনে। তার নাম ছাড়া আমাদের একটি দিন অতিক্রান্ত হয় না। তিনি আমাদের গৌরব। তিনি শায়খুল মাশায়েখ হযরত শাহজালাল মুজাররলে ইয়েমেনী(রঃ)।

সিলেট ছিলো শ্রীহট। গৌড়, লাউ, রাজপুর [তরফ] জৈন্তিয়া, চন্দ্রপুর এবং ইটা সহ ছোট ছোট রাজাদের সার্বভৌম রাজ্য। মুসলিম শাসনের বাইরে ছিলেন এই রাজারা।

বখতিয়ার খিলজির বীরযোদ্ধারা এই পাহাড়ী প্রান্তের দিকে রাজ্য জয়ের আকাংখায় ঘোড়া ছুটিয়ে আসেনি। তথন এসেছিলেন হযরত শাহজালাল (রঃ)। কোন রক্তপাত নয়। যুদ্ধের দামামা নয়। শুধুমাত্র মানব প্রেম এবং ইসলামের পয়গাম পৌছে দিতে এসেছিলেন তিনি।

 বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের শ্যামল ক্রম বর্ধিষ্ণু নগরী সিলেট। যে কেউ এখনই শহরে ঢুকবেন তার চোখে পড়বে সুউচ্চ এক মিনার। প্রতিদিন এই মিনার থেকে আজানের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। শাহজালাল (রঃ) যেদিন এই মাটিতে পা রেখেছিলেন সেদিন ধ্বণিত হয়েছিল আজানের ধ্বণি। খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিল অত্যাচারী রাজা গৌরগোবিন্দের প্রাসাদ। চমকে উঠেছিল এই জনপদ।

খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে গেছে সুরমা। সিলেটকে জালের মতো জড়িয়ে আছে ছোট-বড় নদ নদীর স্রোতধারা। সময় পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে এই উপত্যকার ভূগোল। ইতিহাস নিয়েছে অনেক রক্তাক্ত মোড়।

যতদিন গেছে মানুষ ততো বিস্মৃত হয়েছে ইসলামের সুমহান বাণী। শাহজালাল (রঃ) সিলেটের মানুষের মনে—আচরণে-চিন্তায়-চেতনায় রেখেছেন কালোত্তীর্ণ প্রভাব। এজন্যে এ অঞ্চলের মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদী। এই মাটির সাথে মিশে আছে শাহজালাল (রঃ)’র জন্মভূমির মাটি।

 ১৩০৩ খৃষ্টাব্দ। বাংলার সুলতান তখন শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ। দিল্লীর সিংহাসনে বসে আছেন আলাউদ্দীন খিলজি। তৎকালীন বঙ্গদেশে মুসলিম শাসন শুরু হয়ে গেছে। বখতিয়ার বিলজির বাহিনী ১২০৪ খৃষ্টাব্দে জয় করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে তখন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অনেক আউলিয়া। গৌড় গোবিন্দের আমলে সিলেটেও মুসলমানরা ছিলেন। তাঁদের একজন গাজী বোরহান উদ্দীন (রঃ)। তাঁর পুত্রের আকিকা। তিনি কোরবাণী দিলেন একটি গরু। একটি চিল এক টুকরো গোশত ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। চিলের চঙ্গল থেকে কোরবাণীর গোশত পড়লো গৌড় গোবিন্দের মন্দিরে। রক্তচক্ষু রাজা তল্লাশি চালালেন। ধরে আনা হলো মজলুম বোরহান উদ্দীনকে। কেটে ফেলা হলো তার ডান হাত। খুন করা হলো তাঁর শিশু পুত্রকে।

 মজলুম বোরহান উদ্দিন হাজির হলেন সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ্‌র দরবারে। প্রতিকার চাইলেন নির্মম জুলুমের। সুলতান পাঠালেন সৈন্যবাহিনী সিকান্দার গান্ধীর নেতৃত্বে। সোনারগাঁও থেকে রওয়ানা হলেন তিনি। ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হলেন সিকান্দার গাজী। ধূর্ত গৌড় গোবিন্দের চালাকির কাছে হার মানলেন সুলতানের এই সেনাপতি। পর পর তিনবার তিনি যুদ্ধে পরাজিত হলেন।

এরপরই বদলে গেলো ইতিহাসের দৃশ্যপট। এগিয়ে এলেন হযরত শাহজালাল (রঃ)। তিনি তখন আসছিলেন পূর্ব ভারতের দিকে। সিকান্দার গাজীর ব্যর্থতা ব্যথিত করলো লিল্লির সুলতানকে। গৌড় গোবিন্দকে শায়েস্তা করতে তিনি পাঠালেন নতুন সেনাপতি সৈয়দ নাসিরউদ্দীনকে। পথে মিলিত হলেন দুজন সাতগাঁওয়ের ত্রিবেণীতে।

সিকান্দর গাজীর পর পর পরাজয়ে মুসলিম বাহিনী ভীত হয়ে পড়েছিলো। গুজব ছিলো, গৌড় গোবিন্দ তন্ত্র আর যাদু বিদ্যায় তুখোড়। তাঁর রয়েছে ভূত-প্রেত আর দৈত্য-দানবের বাহিনী। শাহজালাল দরবেশের সঙ্গীরা ছিলেন ফকির এবং ধর্ম যোদ্ধা, সাথে আধ্যাত্নিক মনিষী সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রঃ) যার এক হাজার অশ্বারোহী এবং তিন হাজার পদাতিক সৈন্যের বাহিনী, উপরন্তু সঙ্গে আগের তিন যুদ্ধে পরাজিত সেনাপতি সিকান্দর গাজী। ভীত সন্ত্রস্থ গৌড় গোবিন্দ পালিয়ে গেলেন। আল্লাহু আকবার ধরণি তুলে হযরত শাহজালাল (রঃ)’র মুজাহিদ বাহিনী সিলেট জয় করলো।

হযরত শাহজালাল (রঃ)’র সর্বসম্মত পূর্ণাঙ্গ জীবন কাহিনী এখও রচিত হয়নি বলেই সুধিজনের অভিমত। বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন সময় তাকে নিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন। কিছু কিছু বিতর্কও মতভেদ আছে অনেক বিষয়ে। তবুও অনেক তথ্যই এখন ব্যাপক প্রচলনে স্বীকৃতি পেয়েছে।

হযরত শাহজালাল (রঃ)–র জন্ম ইয়ামন শহরে। পিতার নাম মুহমদ। হযরত শাহজালাল (রঃ) র পূর্ব পুরুষরা ইয়েমেন থেকে তুরস্কে গিয়ে বসতি গড়েন। তাঁর পুরো নাম শেখ-উল-মাশায়েখ মখদুম-বিন-মুহম্মদ। ছোট বেলায় তার মা বাবা মারা যান। তাকে লালন পালন করেন তার মামা সৈয়দ আহমদ কবির। তার মামা বাস করতেন মক্কা শরীফের কাছে। এখানেই হযরত শাহজালাল (রঃ)’র মধ্যে আধ্যাত্মিকতার বিকাশ ঘটে।

সৈয়দ আহমদ কবির একদিন এক মুঠো মাটি দিয়ে হযরত শাহজালাল (রঃ) কে পাঠান হিন্দুস্থানে। ধর্ম প্রচার তার মিশন। তাঁর মামা বলেছিলেন তাকে দেয়া মাটির সাথে যে স্থানের মাটির বর্ণ-গন্ধ-স্বাদের মিল থাকবে সেখানে তিনি স্থায়ী আবাস গড়বেন। সেই মাটিই হবে পাক পবিত্র। যাত্রা শুরু হলো হযরত শাহজালাল (রঃ)-র। তার সাথে এলেন আরেক দরবেশ। নাম তার চাশনী পীর। তার কাজ সৈয়দ আহমদ কবিরের দেয়া মাটির হেফাজত করা এবং বিভিন্ন স্থানের মাটির সাথে তা মিলিয়ে দেখা।

দীর্ঘপথ পেরিয়ে হযরত শাহজালাল (রঃ) একদিন পৌঁছুলেন দিল্লী নগরীর উপকণ্ঠে। বিখ্যাত দরবেশ হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রঃ) তখন বাস করেন পিল্লীর এক প্রান্তে। তিনি তাঁর এক শিষ্যকে পাঠালেন হযরত শাহজালাল (রঃ)’র কাছে। নিজামউদ্দীন আউলিয়া বুঝতে চান এই নবাগত দরবেশকে। হযরত শাহজালাল (রঃ) বুঝতে পারলেন পুরো বিষয়। একটি কৌটার ভেতর জ্বলন্ত অঙ্গার আর তুলা রেখে হযরত শাহজালাল (রঃ) কৌটাটি পাঠালেন নিজামউদ্দীন আউলিয়াকে। কৌটা খুলে বিস্ময়ে চমকে উঠলো নিজামউদ্দীন আউলিয়ার চোখ। ছুটে গেলেন তিনি। স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন হযরত শাহজালাল (রঃ)কে। অপূর্ব এক মিলন ঘটলো দুই মহান দরবেশের। নিজামউদ্দীন আউলিয়া উপহার দিলেন হযরত শাহজালাল (রঃ) কে এক জোড়া সুরমা রঙের কবুতর। সিলেটের আকাশে, শাহজালাল (রঃ)-এর দরগাহ প্রাঙ্গণে এবং সিলেটের অনেক বাড়ীতে পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে যাবার পরও এই কবুতরগুলো বেচে আছে নতুন নাম নিয়ে জালালী কৈতর হিসেবে।

 সিলেট বিজয়ের পর চাশনী পীর পরীক্ষা করলেন সিলেটের মাটি। বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ মিলে গেলো। হযরত শাহজালাল (রঃ) এখানেই পাতলেন তার আস্তানা। সিলেটের শাসনভার ছেড়ে দিলেন সঙ্গীয় দরবেশদের হাতে। তিনি মগ্ন হলেন ইবাদতে। ১৩৪০ সালের একদিন জোহরের নামাজে সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করলেন শাহজালাল (রঃ)।

 সিলেটের মানুষ ১৩৪০ সালে এই বুজুর্গের ইন্তেকালে কতোটা মাতম করেছিলো আমরা তা জানি না। হযরত শাহজালাল (রঃ)-র প্রভাব বৃহত্তর সিলেটের তথা বাংলা ঐ আসামের সংস্কৃতি বদলে দিয়েছে। সারা বৃহত্তর সিলেট জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার সঙ্গী আউলিয়াদের মাজার। হযরত শাহজালাল (রঃ)’র মাজার এবং ইতিহাস ঘিরে তৈরী হয়েছে আধ্যাত্মিক এক পরিমন্ডল। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও শাহজালাল (রঃ)র নাম বাংলা ও আসামের মানুষ স্মরণ করে প্রতিদিন। এখনও কোথাও যখন গান হয়,  তখন মানুষ পরম আবেগে ভক্তি ও বিস্ময়ে এই দরবেশের কথা ভেবে অশ্রুসজল হয়। প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে উদযাপিত হয় হযরত শাহজালাল (রঃ) র উরস মোবারক। দেশবিদেশের ভক্তরা আসেন। সিলেট হয়ে উঠে আধ্যাত্মিকতার এক মিলন কেন্দ্র। যেভাবে সিলেট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। আমাদের জীবনের পরম প্রাপ্তি এই দরবেশের স্মৃতি, ইতিহাস এবং কিংবদন্তী। আমরা ঋণী তাঁর কাছে। তিনি পৌছে দিয়েছেন নিপীড়িত এই জনপদে ইসলামের সাম্যের শান্তির সৌহার্দ্যের চির সত্যের পয়গাম।

হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে অনেক পুস্তক। বেশ কিছু পুস্তক রয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ পাঠাগারে। পেছনের ইতিহাস যতদূর জানা যায়, তা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে প্রথম গ্রন্থটি রচিত হয়েছে ১৬১৩ সালে। গ্রন্থের ভাষা ফার্সী। দ্বিতীয় খন্থটিও ফার্সী ভাষায় লিখিত। নাম ‘রওজাতুস সালেহীন’। লেখকঃ হামিদউদ্দীন। প্রকাশকালঃ ১৭২৩ সাল। পরবর্তী ফার্সী উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ‘সোহাইলে ইয়েমেন’। লেখকঃ মুন্সেফ নাসিরউদ্দীন হায়দার। প্রকাশকালঃ ১৮৬০ সাল। হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে লিখিত প্রথম বাংলা গ্রস্থ হলো ‘শ্রীহট্ট নূর’ । লেখক মুন্সী আবদুর রহিম। প্রকাশকালঃ ১৯০৫ সাল। ঠিক একই সালে আবদুল ওহাব চৌধুরী রচিত ‘শ্রীহট্টে শাহজালাল’ নামের গ্রন্থটি বের হয়। ১৯১০ সালে রজনীরঞ্জন দেব মিত্র লিখেন ‘হযরত শাহজালাল(রঃ)’ নামের একটি গ্রন্থ। এটিই প্রথম একজন অমুসলিম রচিত গ্রন্থ। ১৯১৩ সালে হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে রচিত প্রথম ইংরেজী গ্রন্থ ‘শাহজালাল এন্ড হিজ খাদিমস’ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থেরই লেখককৃত বাংলা অনুবাদ শ্রীহট্র ইসলাম জ্যোতি মুদ্রিত হয় ১৩৩৮ সালে।

তবে হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে রচিত গ্রন্থাদির অনেক বিষয়ে মতভেদ আছে। দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী রচিত হযরত শাহজালাল (রঃ) ও শামসুল আলম রচিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত হযরত শায়খ জালাল খন্থ দুটি বেশী প্রামাণ্য।

হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে রচিত গ্রন্থের সংখ্যা বা নামের তালিকা পাওয়া দুষ্কর। গ্রন্থাবলীর মধ্যে অনেক স্থানীয় লেখকের গ্রন্থও রয়েছে। তাদের মধ্যে, মরহুম চৌধুরী গোলাম আকবর, মরহুম রিয়াছত আলী, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও মরহম আলী মাহমুদ খান প্রমুখ হযরত শাহজালাল (রঃ) কে নিয়ে পুস্তক লিখেছেন। সিলেটে হযরত শাহজালাল (রঃ) গবেষণার জন্যে কোন প্রতিষ্ঠান নেই। যেসব গ্রন্থ ও তথ্য জানা যায় সবই লেখকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত। সর্বসমত ইতিহাস স্বীকৃত কোন গ্রন্থ এখনও তাঁকে নিয়ে লেখা হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারী বা বেসরকারী কোনাে উদ্যোগও নেই। (তথ্য নির্দেশঃ দৈনিক বাংলা বিশেষ সংখ্যাঃ ১৯৯৩) ইতিহাস প্রমাণ করে হযরত শাহজালাল (রঃ) ও তার সঙ্গীয় ৩৬০ জন মুজাহিদ বাহিনী কর্তৃক সিলেট বিজয়ের আগে সিলেটে গাজী বোরহানউদ্দীন (রঃ) টুলটিকর মহল্লায় এবং কাজী নুরউদ্দীন(রঃ) চুনারুঘাট থানার সাটিয়াজুরীর নিকটে ‘কাজীর খিল’ নামক স্থানে পরিবার পরিজন সহ বসবাস করতেন। গাজী বোরহানউদ্দিীন (রঃ) তার পুত্রের আকিকা উপলক্ষে এবং কাজী নূরউদ্দীন (রঃ) তাঁর পুত্রের বিয়ে উপলক্ষে অত্যাচারী মুসলিম বিদ্বেষী রাজা গৌড় গোবিন্দ এবং ভরফের (রাজপুর) রাজা আচক নারায়ণ কর্তৃক অত্যাচারিত হন। এই নির্মম জুলুমের প্রতিকারকল্পে সিলেট ও রাজপুর বিজিত হয়। তরফ বিজয়ে নেতৃত্ব প্রদান করেন সৈয়দ নাসিরউদ্দীন(রঃ)।

কতিপয় ওলি আউলিয়ার মাজার পরিচিতিঃ সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রঃ)। বাগদাদ থেকে দিল্লীতে এসে নিজের পরিচয় গোপন রেখে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। কারো মতে রাজনৈতিক কারণে, কারো মতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে তিনি দিল্লীতে আসেন। সৈয়দ নাসির উদ্দীন ছিলেন দীনের সৈনিক কিন্তু রাতের দরবেশ। আকীদা-আমল-আখলাকে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। নিয়মিত কোরান তিলাওয়াত, রোজা পালন, নামায আদায় করা, ইত্যাদি কর্ম সমুহ তাঁর সারা জীবনে এমনকি জেহাদের ময়দানেও নামায কাজা হয়নি। উদারতা, সত্যনিষ্ঠা ও যাবতীয় মহৎ গুণাবলী ফাতেমী রক্ত ধারার বৈশিষ্ট্য হিসেবে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রঃ)-র জীবনে সার্থকভাবে বিকাশলাভ করেছিল। তিনি ছিলেন ফুলের মত কোমল আবার বজ্রের মত কঠিন। তাঁর অমায়িক ব্যবহার, নেক আমল ও খোশআখলাক তাকে সেনাবাহিনীতে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুসলিম নির্যাতন বন্ধের এবং ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে সিকান্দর খান গাজীর ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে, প্রবল ঝড়ের রাতে তাবুতে বাতি নির্বাপিত না হওয়ার ঘটনায় দিল্লীর বাদশাহর কাছে অসাধারণ ব্যক্তি বলে পরিচিত হয়ে “সিপাহসালার’ পদে উন্নীত হন এবং এর পরই মুসলিম বাহিনী সহ বাংলার দিকে অভিযান পরিচালনা করেন। সিকান্দর খান গাজীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পথে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সহযোগে সম্মিলিত মুজাহিদ আউলিয়া বাহিনী নিয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দের পতন ঘটান এবং সিলেট বিজিত হয়।

সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রঃ)র নেতত্বেরই  ১৩০৪ খৃষ্টাব্দে তরফ বিজিত হয়। তরফ বিজয়ের পর ১২ জন আউলিয়া হবিগঞ্জ ও বৃহত্তর তরফ ও সিলেটের দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দ্যেশে ছড়িয়ে পড়েন। দিল্লীর বাদশা সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রঃ) কে তরফ রাজ্যের শাসনকর্তারূপে সনদ প্রদান করেন। কিন্তু বাদশাহী ও ফকিরী এ দু’ য়ের মধ্যে তিনি ফকিরীকেই মনে-প্রাণে গ্রহণ করেন। তাঁর পবিত্র মাজার হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার ‘মুড়ারবন্দ’ দরগাহ শরীফে অবস্থিত। বারো আউলিয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম ও কোরবাণীর ফলে এদেশে ইসলামের তৌহিদের বাণী ঘরে ঘরে প্রচারিত হওয়ায় এদেশকে বলা হয় “বারো আউলিয়ার মুল্লুক” । উক্ত বারো আউলিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি হচ্ছেঃ

১) সৈয়দ আহমদ গেছুদরাজ শাহপীর কল্লাশহীদ (রঃ)– দেহ কুটান্দর (হবিগঞ্জ) শির মোবারক-খড়মপুর। ইনি কল্লা শহীদ নামে বিশেষভাবে খ্যাত। প্রমত্তা নদীতে এক জেলের জালে তাঁর খণ্ডিত মস্তক উঠে মানুষের মত কথা কয়ে জেলেদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে। নদীর তীরে মস্তকটি কবরস্থ করতে এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ”; ইসলামের এ তৌহিল বাণী সবার কাছে পৌছে দেবার আদেশ জানায়। তিনি হযরত শাহজালাল (রঃ)’ র ভাগিনা এবং সঙ্গীয় তরফ বিজয়ী বারো আউলিয়ার একজন। তার মাথার চুল লম্বা ছিল বলে গেছু দরাজ’ নামে খ্যাত হন। আখাউড়া রেল ষ্টেশনের অনতিদূরে খড়মপুর নামক স্থানে তার দরগাহ অবস্থিত।

( ২) শাহ ফতেহ গাজী (রঃ)– তিনি ছিলেন তরফ বিজয়ে অংশ গ্রহণকারী এক মর্দে মুজাহিদ। তার মাজার রঘুনন্দন পাহাড়ের পাশে ফতেহপুর নামক স্থানে। তার মাযারের কাছে একটি প্রাচীন মসজি আছে। জানা যায়, তিনি ইসলাম প্রচারে এ দেশে এসে এখানেই থেকে যান। তার ভাগিনা তাকে দেশে নিতে আসলে এবং অনেক চেষ্টা করলে তিনি নাকি এই টিলায় গায়েব হয়ে যান।

(৩) শাহ তাজউদ্দিন কোরেশী (রঃ) – ইনি নবীগঞ্জ থানার চৌকিতে অবস্থান করেন। সেখানে তার বংশধর আজও বর্তমান আছেন।

(৪) শাহ বদরউদ্দিন আহমদ (রঃ) – ইতিহাসে উল্লেখ আছে ইনি ইসলাম প্রচারের উদ্যেশে করিমগঞ্জ (বর্তমানে ভারতের অন্তর্গত) মহকুমার বদরপুরে গমন করেন এবং সেখানেই তার মাজার অবস্থিত।

(৫) শাহ মজলিশ আমিন (রঃ) – তিনি উচাইল অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। উচাইলের প্রাচীন বিখ্যাত সুবৃহৎ দীঘি তার দ্বারা খনন করা হয়। উচাইলের মসজিদে আরবী ভাষায় জটিল অক্ষরে তার নাম ও বংশ পরিচিতি খুদিত রয়েছে। এই মসজিদের একটি দরজা চিররুদ্ধ থাকায় এ বিষয়ে নানারকম জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। উক্ত মসজিদের পাশেই তার মাজার অবস্থিত যা এখন নিশ্চিহ্ন অবস্থায় রয়েছে।

(৬) হযরত শাহ আরেফীন (রঃ) – তিনি লাউড় অঞ্চলে ইসলাম প্রচারার্থে যান। লাউড়ের পাহাড়ে তার দরগাহ অবস্থিত।

(৭) শাহ সুলতান কমউদ্দিন (রঃ) – নেত্রকোণা ও লাখাই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। নেত্রকোণা জেলার মদনপুরে তার দরগাহ অবস্থিত।

(৮) শাহ রুকনউদ্দিন আনছারী (রঃ) – তিনি সরাইল, শাহজাদপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। তাঁর নামাঙ্কিত দরগাহ সেখানে অবস্থিত।

( ৯) শাহ মাহমুদ (রঃ)– হবিগঞ্জের লস্করপুরের উর্দুবাজারের সন্নিকটে তার দরগাহ।

(১০) শাহ গাজী (রঃ) – হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার অন্তর্গত বিশগাওয়ের গাজীপুরে তরি রাহি অবস্থিত।

(১১) শাহ শহীদ (রঃ)– লস্করপুরের মুনসিফী কাঁচারীর নিকট তাঁর দরগাহ অবস্থিত।

(১২) শাহ বদর (রঃ) – ইনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। চট্টগ্রামে তার মাজার বিদ্যমান।

 সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রঃ) ও তলীয় সাথী দ্বাদশ আউলিয়ার আদর্শ ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আরও অসংখ্য ওলি-আউলিয়া যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে দ্বীনে মোহাম্মদীর খেদমত করে গিয়েছেন। এইসব পীর-ফকির, গাউছ, কুতুব, অলি, আউলিয়া ও বীর মুজাহিদদের থেকে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলঃ

সৈয়দ শাহ ইবরাহিম (রঃ)– ইনি ইসলাম প্রচারে জীবন অতিবাহিত করেন। আধ্যাত্নিক জ্ঞান ও পরহেযগারীর কারণে তিনি ‘মালেকুল উলামা’ খেতাবে ভূষিত হন। সৈয়দ শাহ ইছরাইল (রঃ)– এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে তিনি এক অতুলনীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং দিল্লীর বাদশাহ হতে ‘মুলুক-উল উলামা’ খেতাবে ভূষিত হন। তাঁর দরগাহ চুনারুঘাটের মুড়ারবন্দ দরগাহ শরীফে অবস্থিত। তিনি “মাদানেল ফাওয়ায়েদ’ নামে ফার্সী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন। সিলেট অঞ্চলে এর চেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ পাওয়া যায়নি। সৈয়দ ইলিয়াছ কুদ্দুস (রঃ)– ইনি সৈয়দ শাহ ইছরাইল মুলুক-উল-উলামা (রঃ) ‘র নবম পুত্র। পিতা হতে শরিয়ত-মারেফতের জ্ঞান লাভ করে এক নির্জন স্থানে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হন। খোয়াই নদীর তীরে এক কুঠিরে ইবাদাত করা কালীন চন্দ্রকিরণের ন্যায় এক জ্যোতি-রেখা তার কুঠিরে প্রবেশ করায় তিনি ‘কুহুব-উল-আউলিয়া’ নামে পরিচিত হন। তাঁর বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সঙ্গীত ‘রাগিনী আহেরী’ বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দরগাহ মুড়ারবন্দে অবস্থিত। সৈয়দ মুসা (রঃ)– ইনি সৈয়দ মিকাইলের জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং আরাকান রাজসভার অমাত্য ও কবি ছিলেন। সৈয়দ সুলতান (রঃ)– ইনি সৈয়দ মুসার কনিষ্ঠ ভ্রাতা। মহাকবি ও মধ্যযুগের সাধক, ‘নবীবংশ’ কাব্যের রচয়িতা। তার মাজার সুলতানশী হাবিলীতে অবস্থিত। সৈয়দ শাহ গদাহাসন (রঃ)– তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এবং দিল্লীর বাদশাহর দরবারে বিষ খেয়ে তার কামালতি প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর নিজ নামে একটি পৃথক পরগণা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি আরাকান রাজার  তরফ থেকে সৈয়দ মুসার তরবারী ও অশ্ব লাভ করেন। তাঁর দরগাহ নরপতি গ্রামের সুবিশাল দীঘির উত্তর পাড়ে বিদ্যমান। সৈয়দ গোয়াস (রঃ)– সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)’র ষষ্ট অধঃস্থন পুরুষ। মাজার মসাজান গ্রামের বিখ্যাত দীঘির দক্ষিণ পশ্চিম কোনে। দীঘিটি তার অমর কীর্তি। সৈয়দ শাহ ছয়েফ (রঃ)– মাজার সাউদনগর হাবিলীতে। সৈয়দ শরফুল হাসান (রঃ)– ইনি এই বংশের একজন মালারজাত মজুৰ অলী। তিনি নরপতির ‘দূধা মিয়া সাহেব’ নামে অধিক পরিচিত। জন্ম ১৭২৭ বাংলার ২৮ শে শ্রাবণ, ইন্তেকাল ১৩৫৪ বাংলার ২১ শে বৈশাখ। তাঁর মাজার নরপতি হাবিলীতে অবস্থিত। সৈয়দ শাহ দাউদ (রঃ)– দরগাহ দাউদনগর হাবিলীতে। সৈয়দ শাহ আহমদ উল্লাহ (রঃ)– মাজার দাউদনগর হাবিলীতে। সৈয়দ শাহ নূরী (রঃ)– মাজার মুড়ারবন্দ। সৈয়দ পীর বাদশা (রঃ)– দরগাহ পৈল হাবিলীতে। পীর বাদশা “গঞ্জে তরাজ’  গ্রন্থ রচনা করেন। সৈয়দ শাহ অছিউল্লাহ (রঃ)– দরগাহ চন্দ্রছুড়িতে। সৈয়দ শাহ আবুল ফযল (রঃ)– দরগাহ খান্দুরা হাবিলীতে। সৈয়দ শাহ ওয়াতের (রঃ)– দরগাহ মুড়ারবন্দে। সৈয়দ শাহ আব্দুল মুতাআলী (রঃ)– দরগাহ সুলতানসী হাবিলীতে। সৈয়দ আব্দুর রহমান (রঃ)– দরগাহ সুলতানশী হবিলীতে। সৈয়দ আব্দুছ ছুবহান (রঃ)– দরগাহ মুড়ারবন্দে। সৈয়দ আব্দুল করিম হোসেনী (রঃ)– দরগাহ অষ্টগ্রাম হাবিলীতে। সৈয়দ আব্দুর রহিম হোসেন (রঃ)– দরগাহ সুলতানসী হাবিলীতে। সৈয়দ আব্দুল হেলিম (রঃ)– দরগাহ সুলতানসী হাবিলীতে। সৈয়দ আব্দুল আযীম (রঃ)– দরগাহ অষ্টগ্রামে। সৈয়দ আব্দুল হেকিম (রঃ)– দরগাহ অষ্টগ্রাম হাবিলীতে। সৈয়দ আহমদ কবীর (রঃ)– দরগাহ সুলতানসী হাবিলীতে। সৈয়দ আব্দুন নুর হোসেনী দীনহীন (রঃ)– দরগাহ সুলতানসী হাবিলীতে, জন্ম ১২৬১ বঙ্গায়, ইন্তেকাল ১৩২৫ বাংলার ৬ই পৌষ। সৈয়দ আব্দুল আলীম (রঃ)– দরগাহ সুলতানশীতে, ইন্তেকাল ১৩৬৪ বাংলার ২রা ফাল্গুন। সৈয়দ জাহেদুল হক (রঃ)– দরগাহ পইল হাবিলীতে,  জন্ম-১৩১৫ বাংলা ইন্তেকাল ২৪ শে ফাল্গুন, ১৩৮৩ বাংলা। সৈয়দ গোলাম মোস্তফা হোসেনী (রঃ)– দরগাহ সুলতানুশী হাবিলীতে, জন্ম ১৩০০ বাংলায়, ইন্তেকাল ১৩৫৩ বাংলার ৬ই ভাদ্র। সৈয়দ গোলাম হায়দর হোসেনী (রঃ)–  দরগাহ সুলতানশী হাবেলীতে,  ইন্তকাল ১৩৮৮ বাংলা ২০শে পৌষ। মাওলানা আব্দুল হামিদ (রঃ)–  দরগাহ উত্তরসুরে, ইন্তেকাল ২৪/৩/১৯৮৪ ইংরাজী। সৈয়দ আব্দুস সহিদ (রঃ)– দরগাহ পূর্ব সুলতানশীতে। সৈয়দ আওলাদ আলী (রঃ)– দরগাহ পূর্ব সুলতানসীতে।

আরও অসংখ্য অলি আউলিয়া এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের মহৎ কর্তব্যে নিয়োজিত থেকে জীবন অতিবাহিত করে গিয়েছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে এবং এই স্বল্প পরিসরে তাদের সবার নাম ও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয় বলে ক্ষমা প্রার্থী।

তথসূত্র : {১) ‘হযরত শাহজালাল (রঃ)’, দেওয়ান কল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। (২) ‘তরফ বিজয়্‌ সৈয়দ মোস্তফা কামাল। (৩) ‘সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র)’, এস.এম. ইলিয়াস। (৪) ‘তরফ এর ইতিকথা’, সৈয়দ হাসান ইমাম হোছাইনী চিশতী। (৫) ‘গবেষণার আলোকে তৱক বিজয়’, সৈয়দ আব্দুল্লাহ। (৬) ‘তরফে সৈয়দ বংশ ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা’, সৈয়দ মাহমুদুল হক। (৭) ‘হবিগঞ্জের মুসলিম মাস’, সৈয়দ মোস্তফা কামাল। (৮) ‘কাশফুল মাহযুব’, দাতা গঞ্জে বখশ (রঃ)। (৯) আল মুরশিদুল আমীন’, ইমাম গাজ্জালী (রঃ)। (১০) ‘গুনিয়াতুত তালেবীন’, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)। (১১) ‘তাজকিয়া ওয়া ইহসান’, সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদবী। (১২) ‘বাংলার আধ্যাত্নিক রাজধানী’, সৈয়দ মোস্তফা কামাল। (১৩) ‘দীনহীন রচনাবলী’, স্মপাদনায়ঃ সৈয়দ হাসান ইমাম হোসাইনী চিশতী। (১৪) ‘মহাকবী সৈয়দ সুলতান সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ স্মারক গ্রন্থ’, [এক.১৯৮৮, দুই.১৯৯১]। (১৫) ‘ইসলামের আলোকে সূফীবাদ ও সাধনা’, ডঃ এম,এ, মোনায়েম। (১৬) ‘ইসলাম ও জীবন’, নুরুল করিম [দৈনিক বাংলা, বিশেষ সংখ্যা ১৯৯৩]

হবিগঞ্জ ইতিহাস প্রণয়ন পরিষদ কর্তৃক ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘হবিগঞ্জ পরিক্রমা’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত। 

মতামত দিন