প্রবন্ধ

জীবন ও মৃত্যু : মানবের শ্রেষ্ঠ অনুধাবন

 

তফসিরে মাযহারিতে আছে, আল্লাহপাক স্বীয় অপার শক্তি ও প্রজ্ঞা দ্বারা সৃষ্টিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেককে এক এক প্রকার জীবন দান করেছেন।

(ক) সর্বাধিক পরিপূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন মানুষকে দান করা হয়েছে। এতে একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার সত্তা ও গুণাবলীর পরিচয় লাভ করার যোগ্যতাও নিহিত রেখেছেন। এই পরিচয়ই মানুষকে খোদায়ী আদেশ-নিষেধের অধীন করার ভিত্তি এবং এই পরিচয়ই সেই আমানতের গুরুভার, যা বহন করতে আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালা অক্ষমতা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মানুষ খোদা প্রদত্ত যোগ্যতার কারণে তা বহন করতে সক্ষম হয়। এই জীবনের বিপরীতে আসে সেই মৃত্যু, যার উল্লেখ কোরআন পাকের নিন্মোক্ত আয়াতে রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে কি যে ব্যক্তি মৃত ছিল সুতরাং আমি তাকে জীবন দান করেছি।’ অর্থাৎ এই আয়াতে কাফেরকে মৃত এবং মুমিনকে জীবিত আখ্যা দেয়া হয়েছে। কারণ কাফের তার উপরোক্ত পরিচয় বিনষ্ট করে দিয়েছে।

(খ) তবে সৃষ্টির কোনো শ্রেণির মধ্যে জীবনের এই স্তর নেই। কিন্তু চেতনা ও গতিশীলতা বিদ্যমান আছে। এই জীবনের বিপরীতে আসে সেই মৃত্যু, যার উল্লেখ নিন্মোক্ত আয়াতে আছে। ইরশাদ হয়েছে : ‘তোমরা ছিলে মৃত, তারপর তোমাদের জীবিত করা হয়েছে, তারপর তোমাদের মৃত্যু দেয়া হবে, তারপর তোমাদের জীবিত করা হবে।’ এখানে জীবনের অর্থ অনুভূতি ও গতিশীলতা এবং মৃত্যুর অর্থ তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

(গ) আবার কোনো কোনো সৃষ্টির মধ্যে এই অনুভূতি ও গতিশীলতা নেই, কেবল বৃদ্ধি পাওয়ার যোগ্যতা আছে। যেমন সাধারণ বৃক্ষ ও উদ্ভিদ এ ধরনের জীবনের অধিকারী। এই জীবনের বিপরীতে আসে সেই মৃত্যু যার উল্লেখ এই আয়াতে রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে আর জীবিত করা হয় মাটিকে তার মৃত্যুর পর। এই তিন প্রকার জীবন মানব, জন্তু-জানোয়ার ও উদ্ভিদের মধ্যে সীমিত। এগুলো ব্যতীত অন্য কোনো বস্তুর মধ্যে এ ধরনের জীবন নেই। তাই আল্লাহপাক প্রস্তর নির্মিত প্রতিমা সম্পর্কে বলেছেন : এগুলো মৃত, জীবিত নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও জড় পদার্থের মধ্যেও অস্তির জন্য অপরিহার্য বিশেষ এক প্রকার জীবন বিদ্যমান আছে। এই জীবনের প্রভাবের কথা কোরআনে পাকে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : ‘এমন কোন বস্তু নেই যা আল্লাহপাকের প্রশংসা করে না।’

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, ‘খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা’ আয়াতে কারীমায় মৃত্যুকে অগ্রে উল্লেখ করার কারণও ফুটে উঠেছে। মূলত মৃত্যুই অগ্রে অস্তিত্ব লাভ করে ও প্রত্যেক বস্তুই মৃত্যু জগতে থাকে, যার ঘোষণা ‘কুনতুম আমওয়াতান’ ‘তোমরা মৃত ছিলে’ বলে দেয়া হয়েছে। তারপর তাকে জীবন দান করা হয়। আল কোরআনে ‘ফাআহইয়াকুম’ বলে সেই দিকেরই নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত এ কথাও বলা যায় যে, পরবর্তী ‘লিয়াবলুয়াকুম আইয়্যুকুম আহছানু আমালা’ আয়াতে মরণ ও জীবন সৃষ্টি করার কারণ ‘মানুষের পরীক্ষাকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরীক্ষা জীবনের তুলনায় মৃত্যুর মধ্যে অধিক প্রযোজ্য। কেননা, যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে উপস্থিত জ্ঞান করবে, সে নিয়মিত সৎ কর্ম সম্পাদনে অধিকতর সচেষ্ট হবে। আর জীবনের মধ্যেও এই পরীক্ষা আছে। কারণ জীবনের প্রতি পদক্ষেপে মানুষ এই অভিজ্ঞতা লাভ করতে থাকে যে, সে নিজে প্রকৃতই অক্ষম এবং আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান। এই অভিজ্ঞতাও মানুষকে সৎ কর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু মৃত্যু চিন্তা নিজের কর্ম সংশোধন ও সৎ কর্ম সম্পাদনে সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসীর রাঃ বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে, রসূলুল্লাহ সঃ বলেছেন : ‘উপদেশের জন্য মৃত্যু এবং ধনাঢ্যতার জন্য বিশ্বাসই যথেষ্ট’। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিত ও রক্তসম্পর্কিত জনদের মৃত্যু প্রত্যক্ষকরণ সবচেয়ে বড় উপদেশদাতা। যারা এই দৃশ্য দেখে প্রভাবান্বিত হয় না, অন্য কিছু দ্বারা তাদের সম্বিত লাভ করা সুদূর পরাহত। আল্লাহপাক যাকে ঈমান ও বিশ্বাসরূপী দৌলত দান করেছেন, তার সমতুল্য কোনো ধনাঢ্য ও অমুখাপেক্ষী নেই। তাই রবী ইবনে আস রঃ বলেছেন : মৃত্যু মানুষকে সংসারের সঙ্গে সম্পর্কহীন করা ও পরকালের প্রতি আগ্রহান্বিত করার জন্য যথেষ্ট। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, মরণ ও জীবনের সঙ্গে জড়িত মানুষের পরীক্ষা সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেছেন : আমি দেখতে চাই তোমাদের মাঝে কার কর্ম ভালো। এ কথা বলেননি যে, কার কর্ম বেশি। এ থেকে বোঝা যায়, কারও কর্মের পরিমাণ বেশি হওয়া আল্লাহপাকের কাছে পছন্দনীয় ব্যাপার নয়, বরং কর্মটি ভালো, নিখুঁত ও মকবুল হওয়াই ধর্তব্য। এ জন্যই কেয়ামতের দিন মানুষের কর্ম গণনা করা হবে না, বরং ওজন করা হবে। এতে কোনো একটি কর্মের ওজনই হাজারো কর্ম থেকে বেশি হবে। আলহামদুলিল্লাহ!

@sat

মতামত দিন