জীবনবৃত্তান্ত

জাস্টিস সৈয়দ মুহাম্মদ মাসিহ, বার-এট-ল

গোকর্ণ সাহেব বাড়ীর (নওয়াব বাড়ী) জাস্টিস সৈয়দ মুহাম্মদ মাসিহ, বার-এট-ল।

গোকর্ণের উকিল, সাহিত্যিক ও দুরবীন পত্রিকার সম্পাদক, ধর্মানুরাগী জনাব সৈয়দ রিয়াজত উল্লাহ সাহেবের কনিষ্ঠ পূত্র সৈয়দ মুহাম্মদ মাসিহ সাহেব ১৮৮২ সালে জন্ম গ্রহন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি গোকর্ণেই সমাপ্ত করেন। তারপর তিনি যথাসময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সম্মানের সাথে বি,এ পাশ করে প্রথম মহাযুদ্ধের আগেই ব্যারস্টারী পড়ার জন্য লন্ডনে চলে।

১৯১৪ সালের জানুয়ারী মাসে লন্ডনের লিন্কনস্ ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যারিস্টারী পাশ করে দেশে ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে প্রাক্টিস আরম্ভ করেন। পেশা হিসেবে আইনকে একান্ত আপন করে নেওয়া এই পরিবারের একটা সম্মানজনক ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উনিশ শতকের প্রথমভাগে তাঁর দাদা সৈয়দ শরাফত উল্লাহ চট্টগ্রাম বিচার বিভাগের স্বনামধন্য কর্মকর্তা (সাব-জজ) ছিলেন। পিতা সৈয়দ রিয়াজতুল্লাহ ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার উকিল ও বড় ভাই নওয়াব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা কলকাতা হাইকোর্টে পূর্ববঙ্গের প্রথম মুসলিম হাইকোর্ট জর্জের সম্মান লাভ করেন।

বেশ কিছুদিন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল আইন পরীক্ষার পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বরিশালের বিখ্যাত শায়েস্তাবাদ নওয়ার বাড়ীর নওয়াব মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীর মেয়েকে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী বেগম সুফিয়া কামালের মামাতো বোন ছিলেন। অতি অল্প বয়সে তাঁর স্ত্রী মারা গেলেও তিনি আর দ্বিতীয় বিবাহ করেন নাই এবং আইন ব্যবসায়েও মনোনিবেশ করতে পারেন নাই। অবশেষে তিনি ১৯২৮ সালে তৎকালে বৃটিশদের জন্য প্রযোজ্য ও রক্ষিত সরাসরি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়ে বীরভুমের সিউড়ীতে যোগদান করেন। বীরভূম থেকে ৩ বছর পর তিনি বদলী হয়ে আসেন চট্টগ্রামে। তখন স্বদেশী আন্দোলনের পুরো জোয়ারের সময়। স্বভাবইতো সেই অগ্নিঝরা চট্টগ্রামের দিনগুলে সমস্ত বৃটিশ প্রশাসনের সঙ্গেই তিনিও চব্বিশ ঘন্টার নিরাপত্তা প্রাপ্ত হন। সেই গভীর পরিস্থিতিতে তাঁর বিপুল প্রশাসনিক দক্ষতা ও ত্রুটিবিহীন নিরপেক্ষতার জন্য তিনি সকল প্রতিকুল বাধাবিপত্তি পার হয়ে আসছেন। খ্যাতনামা আইনজীবী স্যার উইলিয়াম বাক্সটনের সেই দিক নির্দেশনামূলক বানী, “দশজন অপরাধী নিস্কৃত পেয়ে গেলেও একজন নির্দোষও যাতে শাস্তি না পায়” – এটা তাঁর সমস্ত বিচারকার্যের প্রানমন্ত্র ছিল। বৃটিশ আমলে বিচার বিভাগীয় অফিসারদের জনসমাজের সহিত মেলামেশার বিষয়ে কড়া নির্দেশ থাকাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার আংশিক সীমিতকরন হলেও ত্রুটিহীন নিরপেক্ষতা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস করতেন এবং এই নির্দেশ তিনি কখনো লঙ্গন করেন নাই।

তারপর তিনি ১৯৩৩-৩৪ সালে প্রমোশন পেয়ে সিলেট বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি সিলেট বিচার বিভাগের এই সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সে জন্য স্থানীয় সকল শ্রেণীর জনসাধারন বিশেষ করে মুসলমান শিক্ষিত সমাজে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁকে ঐ সমাজ একটি অনুকরনীয় আদর্শ হিসেবে মনের মনিকোঠায় স্থান দেন। এই কথাই আনন্দের সাথে স্মরন করেন সিলেটের কৃতিসন্তান প্রাক্তন মন্ত্রী ও আমেরিকান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল মুহিতের পিতা সিলেটের প্রখ্যাত উকিল মরহুম আব্দুল হাফিজ সাহেব। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মরহুম আহসান উদ্দীন চৌধুরী জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে সিলেট যোগদানের সময় এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে হাফিজ সাহেব এই তথ্য দেন। জনাব চৌধুরী ব্যারিস্টার মাসীহ সাহেবের রায়ের কপিগুলো পড়ার সুযোগ পেয়ে মুগ্ধ হন। ছোট ছোট বাক্যে প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত রায় গুলো আইনের মানগত ঐশ্বর্যে ভরপুর। উল্লেখ করা যেতে পারে জনাব চৌধুরী ব্যারিস্টার মাসিহ সাহেবের নাতনী জামাই।

তারপর নতুন কর্মস্থল ভারতের বৃহত্তর জেলা ময়মনসিংহের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলী হয়ে আসেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী মাসিহ সাহেবের ছোট ছেলের বন্ধু হিসেবে পরিবারের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

তিনি দক্ষতার সহিত এই বিরাট জেলার কার্য সম্পাদনের পরে শেষ কর্মস্থল কলকাতার নিকটতম জেলা বর্ধমানে বদলী হয়ে আসেন। এখান থেকেই ১৯৩৯ সালে অবসর জীবন যাপন করতে কলকাতার প্রাসাদোপম বাড়ী ৮ নং দিদার বক্সলেনে থাকতে আরম্ভ করেন। প্রাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহনের সুযোগে তিনি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য সভ্যতার বিভিন্ন মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে চান নিজের ব্যবহার ও আচরনে।

অশ্বারোহণের প্রতি তার ঝোক ছিল প্রবল। একটি সাদা আরবী ঘোড়া কিনে তার পিঠে ছড়ে প্রাতঃভ্রমন করতে দেখেছে সিলেট, ময়মনসিংহ ও বর্ধমানের জনসাধারন।

চলনেবলনে তীক্ষ্ণ যুক্তিনির্ভর এই ব্যারিস্টারের মধ্যে আমরা পাশ্চাত্যের যেমনি ছাপ দেখতে পাই তেমতি নিজ গ্রামে গিয়ে শৈশবের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের পায়ে ধরে সালামের মধ্যে দেখতে পাই প্রাচ্যের সাংস্কৃতির প্রভাব।

নিজ পেশা ও পেশার বাইরে প্রচুর বন্ধ-বান্ধব ছিল তাঁর। শেরে বাংলা একে ফজলুল সাহেব তাঁকে অনুজপ্রতিম স্নেহ করতেন এবং ব্যারিস্টার সাহেবের অবসরকালীন জীবনে বিভিন্ন কমিশনের মেম্বার করতে উদগ্রীব ছিলেন।

অবসরকালীন সময়ে নিজ গ্রাম গোকর্ণের উন্নতির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেন। নিজ খরচে বাড়ী সংলগ্ন গ্রামের পোস্টঅফিস পাকা দালানে রুপান্তর করেন। তাঁর ছোট চাচার নামে নির্মিত সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ হাই স্কুলের সংস্কার সাধন করেন। সিলেটে অবস্থানকালীন সেখানকার বাংলো বাড়ীর ডিজাইনকে ভালবেসে ফেলেন এবং পারিবারিক বাড়ীর তিনতলা ঐ ডিজাইনে তৈরী করেন। নিজের রং মহল ঐ একই ডিজাইনে নির্মিত। অবসর কালীন একটা বিরাট অংশ বিলেতের কান্ট্রি হোমের মত নিজের গ্রামের বাড়ীতে কাটান।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে কলকাতা ফিরে আসেন এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতার নিজ বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন।

তিনি অল্প বয়সে পত্নীহারা হয়ে নিজ স্নেহ মমতায় আদরে শাসনে ছেলে মেয়েদের মানুষ করে তুলেন। দুই মেয়ে তাঁর জীবিতবস্থাই মারা যায় এবং মৃত্যুকালে দুই ছেলে রেখে যান। বড় ছেলে সৈয়দ মুহাম্মদ মামুন, সমাজ সেবক ও গোকর্ণ ইউনিয়নবোর্ড এর সাবেক প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) ছিলেন। ছোট ছেলে সৈয়দ আমিন স্বপরিবারে কানাডায় বসবাস করতেন এবং সেখানই মৃত্যুবরণ করেন। বড় মেয়ে সৈয়দা হামিদা বানুর বিয়ে হয় ফরিদপুরের গট্টির মরহুম খোন্দকার আহমদ হোসেনের সাথে, যিনি এককালে পূর্ব পাকিস্থানের ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ছোট মেয়ে সৈয়দা রাজিয়া বানুর বিয়ে হয় তাঁরই ভাগিনা কলকাতা প্রেসিডেন্সি কোর্টের জজ পরে পূর্ব পাকিস্থানের জেলা জজ, বানিয়াচঙ্গের রাশিদুল হাসানের সাথে।

মন্তব্য

  • আরো অনেক বড় বড় ব্যাক্তিবর্গ রয়েছেন এই বংশীয়,,, আস্তে আস্তে সলের পরিচয় তোলে ধরুন।
    এই মহতী উদোগক্তাগনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সালাম এবং অভিনন্দন রইলো।পান্জাতনপাঁকের উসিলায় আপনাদের শ্রম আল্লাহ কবুল করুন।।

মতামত দিন